পিংলা কাণ্ডের পরেও টনক নড়েনি

শিশু সুরক্ষায় সমিতি তৈরিতে ঢিলেমি

ইটভাটা থেকে চায়ের দোকান- শিশুশ্রমিকের সংখ্যা কমেনি। বাল্যবিবাহও হচ্ছে আকছার। পিংলা বিস্ফোরণ কাণ্ডে ১৩ জনের প্রাণ গেলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। অথচ শিশুদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন প্রতিরোধ, শিশু পাচার বন্ধে আইন রয়েছে অনেক। রয়েছে বিভিন্ন কমিটিও। প্রশ্ন উঠছে, তা সত্ত্বেও বাস্তবে অধিকাংশক্ষেত্রেই আইনের সফল রূপায়ণ হচ্ছে না। ফলে বদলায়নি শিশুদের যন্ত্রণার চেনা চিত্রও।

Advertisement

সুমন ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৭ অগস্ট ২০১৫ ০০:৩১
Share:

ইটভাটা থেকে চায়ের দোকান- শিশুশ্রমিকের সংখ্যা কমেনি। বাল্যবিবাহও হচ্ছে আকছার। পিংলা বিস্ফোরণ কাণ্ডে ১৩ জনের প্রাণ গেলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। অথচ শিশুদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন প্রতিরোধ, শিশু পাচার বন্ধে আইন রয়েছে অনেক। রয়েছে বিভিন্ন কমিটিও। প্রশ্ন উঠছে, তা সত্ত্বেও বাস্তবে অধিকাংশক্ষেত্রেই আইনের সফল রূপায়ণ হচ্ছে না। ফলে বদলায়নি শিশুদের যন্ত্রণার চেনা চিত্রও।
আইনের প্রয়োগ দূরের কথা। শিশু কল্যাণে নজরদারি চালানোর কমিটিই এখনও তৈরি হয়নি। জেলাস্তরে তো এই কাজ দেখভাল করার জন্য সমাজকল্যাণ দফতর রয়েছেই। তাঁর অধীনে রয়েছে বিশেষ সেল ‘শিশু সুরক্ষা কার্যালয়।’ জেলাস্তরে রয়েছে একটি কমিটিও। আর এ সব দেখভালের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ‘চাইল্ড লাইন’কে। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিটি ঘটনার রাখা যে তাদের পক্ষে সম্ভব নয় তার প্রমাণ মিলেছে বারেবারে।
পশ্চিম মেদিনীপুর-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একাধিক ইটভাটা, বাজি কারখানায় শিশু শ্রমিক দেখা যায়। শিশু শ্রমিকেরা কাজ করে বেড়ায় দোকানে-হাটে-বাজারে। প্রত্যন্ত এলাকায় শিশুকল্যাণের উপর নজরদারি চালাতে ব্লক স্তরে কমিটি তৈরির পাশাপাশি প্রতিটি সংসদেও শিশু সুরক্ষা সমিতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সমিতিতে ছাত্রদেরও রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। কোন ছাত্র কী কারণে পড়া ছেড়ে কোথায় কাজ করছে, কোন মেয়েটির বিয়ের ঠিক হয়েছে সে তথ্য সহজেই তাদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ২৯টি ব্লকে সমিতি তৈরি হলেও সংসদে সমিতি তৈরির চিত্রটা খুবই হতাশাজনক। জেলার ৩৪৯১টি সংসদের মধ্যে মাত্র ৬০৪টি সংসদে এই কমিটি তৈরি করা গিয়েছে। বাকি ক্ষেত্রে ভিলেজ স্তরে ‘শিশু সুরক্ষা সমিতি’ তৈরি করা যায়নি। জেলার ৮টি পুরসভাতেও ওয়ার্ড স্তরে ‘শিশু সুরক্ষা সমিতি’ তৈরি করা যায়নি। এ ব্যাপারে জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিক প্রবীর সামন্ত বলেন, “আমরা দ্রুত গতিতে সমিতি তৈরির চেষ্টা করছি। আমাদের জেলায় সংসদের সংখ্যা একটু বেশি। চলতি আর্থিক বছরে সমিতি তৈরির নির্দেশ এসেছে। কাজ শুরু হয়েছে জুন মাস থেকে। আশা করছি আগামী দু’-তিন মাসের মধ্যে সব স্তরেই সমিতি তৈরির কাজ শেষ হয়ে যাবে।”

Advertisement

শুধু সমিতি তৈরি হলেই তো হবে না। সমিতির কাজ কী তাও বোঝাতে হবে। ততদিনে যে পিংলার মতো আর কোনও শিশুর প্রাণহানি হবে না, বাল্য বিবাহ বা পাচারের ঘটনা ঘটবে না, তা কে বলতে পারে? তা সত্ত্বেও এত উদাসীনতা কেন? এ ব্যাপারে অবশ্য প্রশাসনিক কর্তাদের কাছ থেকে সদুত্তর মেলেনি। প্রশাসনিক সূত্রে দাবি, গত এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে প্রশাসন ১৬টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে! চলতি মাসেও দু’টি বাল্য বিবাহ রোধের ঘটনা ঘটেছে। গত চার মাসে চাইল্ড লাইন বাল্যবিবাহ রোধ, শিশু শ্রমিকদের মূল স্রোতে ফেরানো, পাচার রোধ-সহ ১২৪টি কাজ করেছে। যার মধ্যে প্রায় ১৮ জন শিশু শ্রমিককে মূল স্রোতে ফেরানো হয়েছে বলে চাইল্ড লাইনের জেলা কো-অর্ডিনেটর বিশ্বনাথ সামন্ত জানিয়েছেন।

তবে প্রত্যন্ত এলাকার নাবালিকা মেয়েদের বিবাহ রোধ হোক বা মেয়ে পাচার বন্ধে সচেতনতা বাড়ানো যায়নি। ফলে অনেকেই এ ধরনের ঘটনার কথা জানতে পারলেও নীরবে দেখে যাওয়া ছাড়া কিছু করতে পারেন না। বড় জোর কিছু ক্ষেত্রে থানার নম্বর জোগাড় করে ফোন করেন। থানা থেকে চাইল্ড লাইনকে জানানো হয়। পুলিশ বা চাইল্ড লাইনের লোকজন যাওয়ার আগেই ঘটনা ঘটে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার সময় চাইল্ড লাইন পৌঁছলেও দুষ্কৃতীদের কাছে বাধা পেতে হয়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়ার পর পুলিশ পৌঁছনোর আগেই ঘটনা ঘটে যায়। তাই বিশ্বনাথবাবুর কথায়, “এ বার সংসদের সদস্যরা যেহেতু স্থানীয় তাই নিজেরাই তারা এই ধরনের ঘটনায় জড়িতদের আটকে রাখতে পারবেন। আমরাও খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে সমিতির সদস্যদের সাহায্য পাব। কাজটা অনেক সহজ হবে। সহজেই শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও পাচার রোধ করা যাবে।”

Advertisement

জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিক প্রবীর সামন্তর কথায়, “সব পেশার মানুষকে সমিতিতে রাখার কারণ দ্রুত এই ধরনের খবর মিলবে। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নানা বিষয়ে কথা হয়। কবে কার বিয়ে, কে পড়া ছেড়ে কোথায় কাজ করছে, কোন স্কুল ছাত্রীকে রাস্তায় কারা প্রলোভন দেখাচ্ছে— এসব তথ্য মিলবে। ফলে সহজেই এই ধরনের অপরাধের খবর মিলবে ও তা রোধ করা যাবে।” কিন্তু প্রশ্ন হল, সমিতি তৈরি করতে যদি এত দেরি হয়, তারপর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ শুরু করতে তো আরও দেরি। প্রশাসন অবশ্য জানিয়েছে, এ বার দ্রুত সমিতি তৈরি করতে পদক্ষেপ করা হচ্ছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement