জলে ডুবে রয়েছে সব্জিখেত। নিজস্ব চিত্র।
গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে এখনও জলমগ্ন পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকা। জলে ডুবে রয়েছে চাষের জমিও। ক্ষতি হচ্ছে সব্জির। বাজারেও সব্জির জোগান কম থাকায় বাড়ছে দাম। সংসার চালাতে হিমশিম অবস্থা।
গত শুক্রবার থেকে জমিতে একটানা জল জমে থাকায় মাথায় হাত পাঁশকুড়ার হাউর এলাকার কালিদান গ্রামের বাসিন্দা ভরত মান্নার। তাঁর আশঙ্কা, জলে এক বিঘা জমির পটল, ১৫ কাঠা জমির বেগুন ও ৫ কাঠা জমির করলা নষ্ট হতে বসেছে। রাজ্য সরকারের থেকে ব্লকের সেরা কৃষকের পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। এ বার বন্যা না হলেও টানা বৃষ্টির জলে সব শেষ হয়ে গেল, আক্ষেপ ভরতবাবুর।
টানা বৃষ্টিতে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন কালিদান গ্রামের আর এক চাষি তাপস মাজিরও। জমিতে হাঁটু জল। জমা জলে হলুদ হয়ে যাচ্ছে উচ্ছে, চিচিঙ্গা, ঝিঙে গাছের পাতা। জেলার পাঁশকুড়া ব্লকের হাউর, ঘোষপুর, চৈতন্যপুর-১ ও ২, গোবিন্দনগর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় আমন ধান ও সব্জি খেতেও জল টইটুম্বুর।
টানা বৃষ্টিতে বাজারেও কমছে সব্জির জোগান। ফলে সব্জির দামও বাড়ছে হু হু করে। কালিদান গ্রামের কৃষক ভরতবাবু মঙ্গলবার বলেন, ‘‘প্রবল বৃষ্টির জেরে জল বাড়তে বাড়তে গত শুক্রবার আমার ৬ বিঘে জমির ধানের বীজতলা ছাড়াও সব্জি খেতও ডুবে গিয়েছে। ধান জমির চেয়ে সব্জি খেতও অনেকটা উঁচু হলেও এখনও এক ফুট জল দাঁড়িয়ে রয়েছে।’’
ভরতবাবু বলেন, ‘‘দু’তিন জলে ডুবে থাকার পরে জল শুকিয়ে গেলে পটল গাছ রক্ষা করা যেত। কিন্তু পাঁচ দিন ধরে ডুবে থাকায় সব পটল গাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখনও তিন মাস খেত থেকে পটল পাওয়া যেত। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।’’ জলে উচ্ছেও পচে গিয়েছে বলে জানান তাপসবাবুও।
কয়েকদিন আগেও প্রতি কিলোগ্রাম ঢেঁড়শের দাম ছিল ৩০-৩৫ টাকা। এখন সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ টাকা। বেগুনও অগ্নিমূল্য। বেগুনের দাম ৪০ টাকা ছুঁয়েছে। পটলের দামও চড়া। চিচিঙ্গার দাম ২০-২৫ টাকা প্রতি কিলোগ্রাম থেকে একলাফে বেড়ে হয়েছে ৪০ টাকা। বাঁধাকপি বিকোচ্ছে ৩৫-৪০ টাকা প্রতি কিলোগ্রাম দরে। রেহাই দিচ্ছে না উচ্ছেও। প্রতি কিলোগ্রাম উচ্ছের দাম ৩০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০ টাকা। তমলুক শহরের কলেজপাড়ার সব্জি ব্যবসায়ী কার্তিক সামন্ত বলেন, ‘‘পাঁশকুড়ার পাইকারি সব্জি বাজারে সব্জির দাম অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাই আমরা কম পরিমাণ সব্জি এনে কোনওরকমে ব্যবসা চালাচ্ছি। বেশি দামের দরুন ক্রেতাদের সামলাতে আমাদেরই হিমশিম খেতে হচ্ছে।’’ তমলুকের বড়বাজারের আর এক সব্জি ব্যবসায়ী শচীন্দ্রনাথ হাজরার মতে, ‘‘পাঁশকুড়া-সহ যে সব এলাকা থেকে মূলত সব্জি আসে, সেই এলাকাগুলির অধিকাংশই জলমগ্ন। ফলে সব্জিরজোগান কমায় দামও বেড়েছে।’’
সব্জির চড়া দামের দরুন বাজার করতে এসে নাভিশ্বাস উঠছে মধ্যবিত্তের। তমলুকের বাসিন্দা প্রদীপ্ত খাটুয়া বলেন, ‘‘আচমকা বন্যার ফলে সব্জি খেত নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে শুনেছি। তবে সব্জির দাম এতটা বাড়বে বলে বুঝতে পারিনি।’’ একইভাবে, তমলুকের আর এক বাসিন্দা লমৃণাল পাল বলেন, ‘‘বন্যার জন্য সব্জির জোগান কম থাকায় দাম বাড়তে পারে। তবে এতটা দাম বাড়ায় সংসার চালাতে সমস্যা হচ্ছে।’’
জেলা উদ্যান পালন দফতরের আধিকারিক স্বপনকুমার শীট বলেন, ‘‘জেলায় এখনও পর্যন্ত প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী ২ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন সব্জি চাষের ক্ষতি হয়েছে। সব্জি চাষের একটি বড় অংশ পাঁশকুড়া, কোলাঘাট, পটাশপুর, এগরা এলাকায় রয়েছে।’’ তিনি আরও জানান, জলে ২ হাজার ৫০৮ হেক্টর জমির পান, ১ হাজার ১৫ হেক্টর জমির ফুল ও ১ হাজার ২০৩ হেক্টর জমির মশলা চাষেরও ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।