মেদিনীপুর সার্কিট হাউসে বৈঠক।—নিজস্ব চিত্র।
কৃষি খামার রয়েছে। রয়েছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিও। তবু চাষের জন্য ভিন্ রাজ্যের বীজের উপরেই ভরসা করতে হয় এ রাজ্যের কৃষকদের। কারণ, কৃষি খামারগুনিতে সামান্য কিছু ধইঞ্চা, ধান, তিলের বীজের বেশি কিছু তৈরি হয় না। বেশিরভাগ জমিই পতিত পড়ে থাকে।
এই সঙ্কট কাটাতে এ রাজ্যে বীজ তৈরির উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানালেন রাজ্যের নতুন কৃষি মন্ত্রী অরূপ রায়। বৃহস্পতিবার মেদিনীপুর সার্কিট হাউসে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া এই চার জেলার কৃষি আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে কৃষিমন্ত্রী বলেন, “এখনও বাইরের থেকে আলু বীজ আনতে হয়। ফলে কিছু ব্যবসায়ী একাধিপত্য কায়েম করেছে। তা ভাঙতে রাজ্যে বীজ তৈরির পাশাপাশি চাষিরা যাতে সমস্যা না পড়ে সে জন্য নানা পরিকল্পনা করা হচ্ছে।” সেচের সঙ্কট কাটাতে সেচ দফতরের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
এ দিন যে চার জেলার কৃষি পরিস্থিতি জানতে মন্ত্রী বৈঠক করেন, তার মধ্যে তিনটিই (পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া) জঙ্গলমহলের জেলা। জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও বৃষ্টি নির্ভর চাষ। ভারী বর্ষণ হলে চাষ হয়, নাহলে জলাভাবে মাঠেই শুকিয়ে নষ্ট হয় ধান। সেচের সমস্যার জন্যই এই পরিস্থিতি। বিভিন্ন মরসুমে আবার সরকারি ভাবে ফসলের মিনিকিট, সার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও চাষিদের কাছে তা ঠিক সময়ে পৌঁছয় না। ফলে উত্পাদন বৃদ্ধির উপর সরকার যতই জোর দিক না কেন, বাস্তবে তার সুফল মেলে না। এ দিন কৃষিমন্ত্রীও স্বীকার করে নেন, “জঙ্গলমহলের জেলাগুলি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত।” তবে বর্তমান সরকার এই সব পিছিয়ে পড়া জেলায় কৃষির উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। আর সে জন্যই খরিফ মরসুমের আগে কৃষি পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এ দিনের বৈঠক।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় আলু চাষ হয় বেশি। অথচ, আলু বীজের জন্য কৃষিজীবীদের তাকিয়ে থাকতে হয় পঞ্জাবের দিকে। সেই সুযোগে পঞ্জাবের ব্যবসায়ীরা আলু বীজের দাম বাড়িয়ে দেন। শুধু আলু নয়, তৈলবীজ থেকে শুরু করে ধান কোনও ফসলের ক্ষেত্রেই সরকারি ভাবে বীজ সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। চাষিদের বাধ্য হয়ে বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি দামে বীজ কিনতে হয়। ঝুঁকিও থাকে। কারণ, বীজের গুণগত মান খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা নেই। ফলে, অনেক সময়ই চাষিরা বেশি দামে বীজ কিনেও যথাযথ ফলন পান না। অথচ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাতেই ১২টি বীজ তৈরির খামার রয়েছে। সেখানে রয়েছেন কর্মী, কৃষি আধিকারিক এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিও। তবু একরের পর একর জমি পতিত পড়ে থাকে। অভিযোগ, সরকারি উদাসীনতার কারণেই বীজ তৈরি করা যায় না। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির বীজ ব্যবসায়ীরা একাধিপত্য কায়েম করেছেন। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মন্ত্রী এ দিন বৈঠকে কৃষি আধিকারিকদের কাছে প্রশ্ন তোলেন, এত বীজ খামার থাকা সত্ত্বেও বীজ তৈরি করা যাচ্ছে না কেন? যে সব এলাকায় বীজ খামার রয়েছে সেখানকার মাটি তো বীজ তৈরির উপযোগী। কৃষি আধিকারিকেরা অবশ্য নীরবই থেকেছেন। তখন মন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, বীজ তৈরি বাড়াতে হবে। যাতে অন্য রাজ্যের উপরে নির্ভর করতে না হয়।
মত্স্য চাষেও বর্তমান রাজ্য সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে এ দিন জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “এখনও বাইরে থেকে আমাদের মাছ আনতে হয়। অথচ, আমাদের এখানে মাছ চাষের অনেক সূযোগ রয়েছে। আমরা মত্স্য চাষ বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিচ্ছি। যে সব এলাকায় সেচের সমস্যা রয়েছে, সেচ দফতরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেচের সমস্যাও মেটাব।” এ দিনের বৈঠকে চার জেলার কৃষি আধিকারিকরা ছাড়াও পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনা ও পশ্চিম মেদিনীপুরের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ নির্মল ঘোষ উপস্থিত ছিলেন।