উমার আগমনে লক্ষ্মী ওড়ে সীমান্তে

ঠারেঠোরে যেন যাত্রা। নড়বড়ে রিকশা থেকে হাওয়ায় উড়ছে ভুল বানানের লিফলেট—‘সংগ্রহ করুন সিজন কাড (কার্ড), জমিন টিকিট।’ আছে মাইকে ধরা গলায় ঘোষণা, ‘পুজোর আগে মাঠ কাঁপাই দিবে বিদেশিরা।’

Advertisement

গৌরব বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:৩৩
Share:

ঠারেঠোরে যেন যাত্রা।

Advertisement

নড়বড়ে রিকশা থেকে হাওয়ায় উড়ছে ভুল বানানের লিফলেট—‘সংগ্রহ করুন সিজন কাড (কার্ড), জমিন টিকিট।’ আছে মাইকে ধরা গলায় ঘোষণা, ‘পুজোর আগে মাঠ কাঁপাই দিবে বিদেশিরা।’

সেই সঙ্গে নিশ্চয়তা, ‘মহিলাদের বসিবার ও সাইকেল রাখিবার সুব্যবস্থা আছে।’ পুজোর মুখে সীমান্তে যেন আগমনি সুর।

Advertisement

নাইজেরিয়া, উগান্ডা, নামিবিয়ার সেই খেলোয়াড়রাই এখন সীমান্তের ‘স্টার’। লক্ষ্মীলাভের মূলধনও বটে।

গত কয়েক বছর ধরে উমা আসার আগেই শরতের আকাশে উড়ছে লক্ষ্মী। টাকা ঢালছেন স্থানীয় লোকজন। টিকিট কেটে টানটান বিনোদনে খুশি দর্শক। লাভের অঙ্কে আপ্লুত আয়োজকেরাও।

পরব শুরু হয়ে যায় ইদ-উল-ফিতর থেকেই। তারপর ইদুজ্জোহা ও বিশ্বকর্মা। দুর্গাপুজোর আগে নদিয়া-মুর্শিদাবাদ সীমান্তে মাঝের এই ক’টা দিন ভরাট করে দেয় ফুটবল। গ্রামীণ মাঠে চলা দিনভর সেই হইহই, উচ্ছ্বাস, ভিড় জানান দেয়— দুয়ারে দুগ্গা।

করিমপুরের এক ক্লাব কর্তা কবুল করছেন, ‘‘এই সময়ে কর্মসূত্রে বাইরে থাকা ছেলেরা ঘরে ফেরে। পাট ও সব্জির সৌজন্যে মানুষের হাতে টাকা থাকে। আর সেই কারণেই ফুটবলও ভালই লোক টানে।’’

নদিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সুজিত বিশ্বাস জানাচ্ছেন, ফুটবল নিয়ে সীমান্তের মানুষের আবেগ বহু দিনের। কিন্তু শুধু আবেগ দিয়েই তো আর ফুটবল চলে না। অর্থটাও খুব জরুরি। সেখান থেকেই ‘খেপ’ খেলার শুরু। একসময় খেলোয়াড়রা স্রেফ মাংস-ভাত খেয়েই খেলে দিতেন। কিন্তু এখন টি-টোয়েন্টির যুগে লোক টানতে গেলে চমক দরকার। আর সেই চমকের কাজটাই করে দিচ্ছেন বিদেশি খেলোয়াড়েরা।

সুজিতবাবু জানাচ্ছেন, কলকাতায় যোগাযোগ করেই ওই বিদেশি ফুটবলারদের নিয়ে আসা হয়। ম্যাচ পিছু চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে খাবার ও যাতায়াত ভাড়া। আর তাতেই দুই জেলার মাঠ ভরছে কানায় কানায়।

তবে চমকের আড়ালে এই বিদেশিদের অধিকাংশের পরদেশে জীবনযাপন বেশ কষ্টের। কলকাতার নামী ক্লাবের এক কর্তা জানাচ্ছেন, নাইজেরিয়া, উগান্ডা ও নামিবিয়ার মতো আফ্রিকার বহু দেশ থেকে পড়াশোনার ছাড়পত্র নিয়ে এ দেশে আসেন ওই আফ্রিকানরা। তিনি বলেন, ‘‘কিন্তু, এ দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতামান পেরোতে না পেরে পড়াশোনাটার আর হয়ে ওঠে না তাঁদের। টিঁকে থাকার লড়াইয়ে ফুটবলটাকেই বেছে নেন তাঁরা।’’

তাঁরা সকলেই যে দড় খেলোয়াড়, এমনটাও নয়। কলকাতা ময়দানে তাই জায়গা হয় না তাঁদের। ওই কর্তা জানান, বড়সড় চেহারা দেখে জেলার অনামী ক্লাবগুলো সামান্য টাকায় তাঁদের ম্যাচ খেলাতে নিয়ে যায়। এক ঢিলে দুই পাখি মেরে ফুটবল ও ব্যবসা দুই-ই হয়।

তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না সীমান্তের। এবড়োখেবড়ো ফুটবল মাঠে ডেভিড, স্টিভেন, জ্যাকশন কিংবা সেবাস্টিয়ানরাই বড় চমক। যাত্রা কিংবা নাইট-এর ‘স্টার’দের মতো তাঁদের জন্যও তৈরি করা হয় ‘ড্রেসিং রুম’। খেলা শুরুর আগে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় মাঠে।

পিছু পিছু ছোটে উৎসাহী ছেলেপুলের ভিড়—‘আরিব্বাস, কী পেশি দেখেছিস?’ কিংবা ‘ওই পায়ের শটে বল কোথায় যাবে বল তো?’

শনিবার থেকে ডোমকলের ফতেপুর বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্যোগে শুরু হচ্ছে তিন দিনের নক আউট ফুটবল প্রতিযোগিতা। ক্লাবের কর্মকর্তা মইদুল ইসলাম বলছেন, ‘‘বাজেট প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। বিদেশি খেলোয়াড়দের ছবি ছাপিয়ে প্রচার করা হয়েছে। আশা করছি লোকসান হবে না।’’

জোর গলায় সীমান্তও বলছে—গুণে গুণে যাত্রা কিংবা নাইটকে দশ গোল দিতে পারে এই ফুটবল। (তথ্য সহায়তা—সুজাউদ্দিন)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement