সুবিচারেও কান্না থামছে না ছবিরানির

মঙ্গলবার দুপুরে নবদ্বীপ আদালতে অরুণ নন্দী হত্যা মামলায় দুই অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়ার কথা শুনে দু’হাত জোড় করে কেবলই কেঁদে চলেছেন ছবিরানি।

Advertisement

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০২:১৯
Share:

নিজের বাড়িতে। —নিজস্ব চিত্র।

পঁচাশি বছরের অশক্ত দেহটা নিয়ে টানা তিন চার মিনিটের বেশি এখন আর বসতে পারেন না তিনি। মাথার শিয়রে নানা রকম ওষুধ নিয়ে সারাক্ষণ প্রায় শয্যাশায়ী থাকতে হয় নবদ্বীপের খুন হওয়া সিপিএম নেতা অরুণ নন্দীর মা ছবিরানি নন্দী।

Advertisement

মঙ্গলবার দুপুরে নবদ্বীপ আদালতে অরুণ নন্দী হত্যা মামলায় দুই অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়ার কথা শুনে দু’হাত জোড় করে কেবলই কেঁদে চলেছেন ছবিরানি। বার বার বিছানা থেকে উঠে বসতে চাইছেন। কেমন যেন অস্থির ভাব। তিনি ঘুরেফিরে সেই একটাই কথা বলছেন, ‘‘শুধু এই দিনটার জন্যই গুরু আমারে বাঁচিয়ে রেখেছেন।”

প্রায় ছ’মাস হয়ে গেল গুরুতর অসুস্থ ছবিদেবী। ওলাদেবীতলার যে বাড়িতে অরুণবাবু খুন হয়েছিলেন, সেই বাড়ি ছেড়ে এখন তিনি থাকেন নবদ্বীপ তেলিপাড়ায় বড় মেয়ের কাছে। মেয়ে শুক্লা দাস বলছেন, ‘‘দাদা খুন হওয়ার পর থেকেই মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাস ছয়েক আগে মা পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক চোট পান। প্রায় আড়াই মাস কোমায় ছিলেন। মাসখানেক থেকে একটু সুস্থ। সারাদিন শুধু দাদার কথা বলেন, আর কান্নাকাটি করেন।”

Advertisement

অরুণবাবু খুন হওয়ার সময় ছবিদেবীর বয়স ছিল আশি। তখনও অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরাও করতে পারতেন না। কিন্তু একমাত্র ছেলের খুনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে দু’-দুবার আদালতে এসে দুঁদে আইনজীবীদের চোখে চোখ রেখে যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সকলকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। প্রথম বার তিনি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই। অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীদের একের পর এক প্রশ্ন তিনি যে ভাবে সামলেছেন, অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সকলেই। তার কয়েক মাসের মধ্যে ফের তাঁকে আদালতে আসতে হয়।

২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে দ্বিতীয় বার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ছবিদেবী। ভাদ্রের দুপুরে প্রচণ্ড গরমে সাক্ষীর কাঠগড়ায় একটি চেয়ারের উপর আরও একটি কাঠের টুল দিয়ে তাঁকে পাঁজাকোলা করে কোনও রকমে বসানো হয়। তাঁকে সারাক্ষণ ধরে রাখেন এক মহিলা পুলিশকর্মী। ঘণ্টাখানেক ধরে সাক্ষ্যদান চলার পরে তিনি অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। বিচারকের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এ দিনও তাঁর কান্নার বিরাম ছিল না। বড় মেয়ে শুক্লাদেবীর এক চিলতে ঘরে বিছানায় শুয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলেন, “এত দিন সব হজম করে ছিলাম। শুধু ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কিন্তু গুরুদেবের আশীর্বাদে এই দিনটা দিনটা দেখতে পেলাম।” পুরকর্মী অরুণবাবুর পেনশনের কিছুটা অংশ পান ছবিদেবী। তাতেই কোনওরকমে তাঁর চলে যাচ্ছে। মায়ের অযত্ন হতে দেন না অরুণবাবুর বোন শুক্লাদেবীও। তাঁর কথায় “দাদাকে বাঁচাতে পারিনি। মায়ের সুস্থ রাখার জন্য কোনও কিছুর খামতি রাখি না। মাকে শুধু একটাই কথা বলতাম, দাদার সুবিচারের জন্য তোমাকে ভাল থাকতেই হবে।” ফের চোখ দু’টো ভিজে যায় ছবিরানির।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement