নেই-নোটে ডুবল মাস পয়লাও

আশঙ্কা ছিলই। মাস পয়লাতে সেটাই সত্যি হল! বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এটিএম কাউন্টার ও ব্যাঙ্কের সামনে লাইন আরও দীর্ঘ হয়েছে।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৬ ০২:০২
Share:

পেনশনের চালচিত্র। কৃষ্ণনগর হেড পোস্টঅফিসে। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।

আশঙ্কা ছিলই। মাস পয়লাতে সেটাই সত্যি হল!

Advertisement

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এটিএম কাউন্টার ও ব্যাঙ্কের সামনে লাইন আরও দীর্ঘ হয়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ভোগান্তি। হয়রান হতে হয়েছে প্রবীণদের। এবং দিনের শেষে প্রাপ্তির ভাঁড়ার কারও শূন্য। কেউ আবার বাড়ি ফিরলেন বিড়বিড় করতে করতে, ‘‘এই ক’টা টাকা দিয়ে কী করব?’’

নোট বাতিলের পরে অনেকেই ভেবেছিলেন, যাবতীয় সমস্যা নভেম্বরেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে ততই বেড়েছে সমস্যা। সকলেরই আশঙ্কা ছিল, মাস পয়লাতে ব্যাঙ্ক সব কিছু সামাল দিতে পারবে তো? দিনের শেষে দেখা গেল, সামাল দেওয়া তো দূরের কথা, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

Advertisement

কৃষ্ণনগরের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সদর শাখায় পাঁচটি কাউন্টার রয়েছে। হাজার মানুষের ভিড়। সাধারণ গ্রাহকদের পাশাপাশি এ দিন পেনশন তুলতে এসেছিলেন প্রবীণেরাও। ব্যাঙ্কের এই শাখা থেকে প্রায় ১২ হাজার মানুষ পেনশন তোলেন। এ দিন তাঁদের কথা ভেবে
আলাদা কাউন্টারের ব্যবস্থা করা হলেও সেই লাইনও নেহাত ছোট ছিল না। তবে প্রবীণদের কষ্টের কথা মাথায় রেখে তাঁদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হলেও টাকার পরিমাণ এ
দিন একলপ্তে অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়।

বুধবার পর্যন্ত গ্রাহকদের দিনে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ওই শাখা। এ দিন টাকার অভাবে সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। এ দিন তাঁরা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা করে দিতে পেরেছেন। পাশাপাশি অন্য ব্যাঙ্ক বা তাদেরই অন্য শাখার গ্রাহকদের এ দিন থেকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ।

সাবিত্রী সরকার, বয়স ৮৫, কালীনগর

কোমরে যন্ত্রণা। হাঁটুতেও ব্যথা। সেই সকাল থেকে
লাইনে দাঁড়িয়ে হাতে পেলাম সাকুল্যে ১৫ হাজার টাকা।
ক’দিন পরে ফের ব্যাঙ্কে আসতে হবে ভেবে
এখন থেকেই শিউরে উঠছি।’’

আনন্দময়ী মালাকার, বয়স ৬৫, কৃষ্ণনগর

মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু ব্যাঙ্কে আবার প্রবীণদের জন্য বসার জায়গা বা আলাদা কাউন্টারের ব্যবস্থা না করায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে। বহরমপুরের কাদাই জল ট্যাঙ্কের মোড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের একটি শাখায় সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন ছিল। এ দিন সকাল সাড়ে ১১ টা নাগাদ পেনশন তুলতে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী অঞ্জন চক্রবর্তী। দীর্ঘ লাইনে বেশ কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরে তিনি টাকা তুলতে পেরেছেন। ব্যাঙ্ক থেকে ফেরার পথে ক্ষুব্ধ অঞ্জনবাবু বলছেন, ‘‘এ রকম চললে তো ব্যাঙ্কে এসে অসুস্থ হয়ে পড়তে হবে। প্রবীণ নাগরিকদের কথা ভেবে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের আলাদা কাউন্টার ও বসার জায়গার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।’’

ডাকঘরে গিয়েও হয়রান হয়েছেন অনেকেই। বুধবার কৃষ্ণনগর মুখ্য ডাকঘরে পেনশন তুলতে এসেছিলেন রাধানগরের সুকুমার সাহা। তাঁর দরকার ছিল আট হাজার। সেই মতো তিনি উইথড্রল স্লিপে আট হাজারই লিখেছিলেন। ডাকঘরের লোকজন ছ’হাজারের বেশি দিতে রাজি হননি। অগত্যা তাঁকে আবার নতুন করে স্লিপ লিখে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। সুকুমারবাবু বলছেন, ‘‘আমাদের মতো বৃদ্ধ মানুষকে নিয়ে সরকার আর কত ছেলেখেলা করবে?’’

বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদের বেশির ভাগ ডাকঘরগুলিতেও ছিল নেই নেই সুর। মঙ্গলবার ব্যাঙ্ক থেকে আসা টাকায় কোনও রকমে চলেছে। বৃহস্পতিবার টাকাই পায়নি ডাকঘরগুলি। শুক্রবার থেকে কী অবস্থা দাঁড়াবে তা ভেবে শিউরে উঠছেন ডাক বিভাগের কর্মীরা।

মুর্শিদাবাদের লিড ব্যাঙ্ক ম্যানেজার অমিত সিংহ বলছেন, ‘‘ব্যাঙ্কে এসে প্রবীণ নাগরিকদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয় সেটা দেখতে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে ব্যাঙ্কে পরিকাঠামো না থাকায় জন্য সব জায়গায় সেটা করা সম্ভব হয়নি।’’ আর নদিয়ার লিড ব্যাঙ্কের ম্যানেজার সুগত লাহিড়ি বলছেন, ‘‘টাকার যথেষ্ট জোগান না থাকার জন্য এমনটা হচ্ছে। এই অবস্থাতেও আমরা চেষ্টা করেছি, যাতে কোনও প্রবীণ খালি হাতে না ফেরেন।’’

কিন্তু টাকার জোগানই যদি যথেষ্ট না থাকে, তাহলে কী করে প্রবীণেরা তাঁদের চাহিদা মতো টাকা পাবেন? সে প্রশ্নের অবশ্য কোনও সদুত্তর মেলেনি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement