দেবতার ভোগে রকমারি সরবত। — নিজস্ব চিত্র
হিসাবের মাস চৈত্রের শেষদিনে ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। সারা বছরের হিসাবের খাতা এদিন ‘হাল’ করতেই হবে। কিন্তু তার থেকেও বেশি ব্যস্ততা গৌড়ীয় বৈষ্ণব মঠ-মন্দিরগুলিতে। দীর্ঘ শীত এবং বসন্তের শেষে এদিন থেকেই শুরু হবে ‘কেশবব্রত’। অন্য নামে ‘জলসংক্রান্তি ব্রত’। পানীয়ং প্রাণীনাং প্রাণাঃ পানীয়ং পাবনং মহৎ ,পানীয়স্য প্রদানেন প্রীয়তাং মে জনার্দনঃ। শাস্ত্র মতে প্রবল গরমের হাত থেকে প্রাণীকুলকে রক্ষা করতেই এই ব্রতের পালন।
মধুসূদন মাস। বৈষ্ণবদের নিজস্ব পঞ্জিকায় বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্র এই নামেই পরিচিত। মধুসূদন মাসের শেষ দিনটি মহাবিষুব সংক্রান্তি। এই দিন থেকেই বদলে যায় দেবতাদের খাদ্যতালিকা। গরমের কারণে বৈষ্ণব মঠমন্দিরে দেবতার ভোগের পদেও লাগে পরিবর্তনের ছোঁয়া। আর সেখানে ঠান্ডা পানীয়ের জয় জয়কার। সকালের বাল্যভোগ থেকে রাত্রিকালীন ভোগ সবেতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায় গরমকালভর। কোথাও আখের গুড় দিয়ে যবের ছাতু, তো কোথাও ডাবের জল। আবার কোনও মন্দিরে বৈশাখ মাসভর সাত আট রকমের সরবত দিয়ে সাজানো হয় দেবতার ভোগ।
যেমন ধামেশ্বর মহাপ্রভু মন্দিরে গরম পড়তেই বেড়ে যায় ফলের ব্যবহার। মধ্যাহ্নে পখাল, বিকেলে ডাব। প্রবীণ সেবায়েত লক্ষ্মীনারায়ণ গোস্বামী জানান বাল্যভোগে মরসুমি ফলের সঙ্গে দেওয়া হয় কচি তালশাঁস। পানীয় হিসাবে কেবল ডাব। দুপুরের দিকে দেওয়া নানা রঙের সরবত। বেলের পানা দিয়ে হলুদ রঙের সরবত, তরমুজ দিয়ে লাল রঙের সরবত মুসুম্বি লেবু অথবা আঙুর দিয়ে সবুজ রঙের সরবত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয় ধামেশ্বরকে।
তবে সরবত ভোগের বৈচিত্রে নবদ্বীপের মদনমোহন মন্দির এবং বলদেব জিউর মন্দির অতুলনীয়। শতবর্ষের ঐতিহ্য মেনে বৈশাখ মাসের ঠিক আগের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় ঠান্ডা পানীয়ের বিপুল আয়োজন। মন্দিরের সেবায়েত তথা নিত্যানন্দ উত্তরসূরি প্রাণগোপাল গোস্বামী প্রায় একশো বছর আগে প্রতিদিন বিকেলে মদনমোহনকে ন’রকমের সরবত ভোগ দেওয়ার এই রীতি প্রচলন করেন। মিছরি, তরমুজ, ঘোল, বেল পানা, ছানা পানা, শিখরিণী সরবত, ঠান্ডাই, গোলাপ কন্দের সরবত প্রভৃতি নয় রকমের সরবত গরমকাল জুড়ে প্রতিদিন বিকেলের ভোগে নিবেদন করা হয়। মধ্যাহ্নের ভোগে বাধ্যতামূলক ভাবে দেওয়া হয় যবের ছাতু সঙ্গে আখের গুড়, কাঁঠালি কলা। মদনমোহন মন্দিরের নিত্যগোপাল গোস্বামী জানান, “প্রতিদিন বিকেলে নয় রকমের সরবতই ভোগে দিতে হয়।”
সাদা দই ভালো করে ফেটিয়ে তার সঙ্গে কাজু বাটা এবং দুধ মিশিয়ে ভাজা জিরের গুড়ো মিশিয়ে হয় শিখরিণী সরবত। ঠান্ডাই তৈরি হয় পোস্ত, কাঠবাদাম, পেস্তা, গোলমরিচ বেটে দুধ ও চিনির সঙ্গে মিশিয়ে। উপরে ছড়ানো থাকে গোলাপের পাপড়ি। তবে ‘গোলাপ কন্দের’ সরবতের প্রধান উপকরণ অবশ্য স্থানীয় বাজারে মেলে না। আনতে হয় কলকাতা থেকে। অন্যথায় গোলাপ জল। সরবতের সঙ্গে দেওয়া হয় ফল। তবে সেখানেও বিশেষত্ব আছে। মুগডাল ভেজানো, ছোলা ভেজানো, কাঠবাদাম, পেস্তা, খেজুর এবং কাজু ভোগের থালায় থাকতেই সঙ্গে। অন্য মরসুমি ফল।
ও দিকে বলদেব মন্দিরে চৈত্র সংক্রান্তির দিন মরসুমের প্রথম পানীয় হিসাবে দেওয়া হয় ছাতুর সরবত। মিছরি ভেজানো জলে ছাতু গুলে তার সঙ্গে পাতিলেবুর রস এবং আদা কুচো মিশিয়ে এই দিন বিকেলে প্রথম নিবেদন করা হয় বলদেব জিউকে। কিশোরকৃষ্ণ গোস্বামী জানান, ‘‘সাত থেকে আট রকমের সরবত বৈশাখ মাসভর দিতে হয়। কাঁচাআম পোড়া, বেলের সরবত, ডাবের ঠান্ডাই, ঘোল, দইয়ের লস্যি, তরমুজ, আঙুর, মুসুম্বি লেবু, পেস্তার সরবতের মতো নানা ধরনের সরবত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিবেদন করা হয়।’ নানা সরবতের মধ্যে ঠান্ডাইয়ের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। কাঠবাদাম, কাজু, পোস্ত, মৌরি, গোলমরিচ এবং শুকনো গোলাপের পাপড়ি এক সঙ্গে বেটে মিছরির জলের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হয় ঠান্ডাই সরবত। আর গোলাপ জলে বাদাম বাটা, মিছরি মিশিয়ে হয় পেস্তার সরবত। যার উপরে ভাসতে থাকে ঘন পেস্তার কুচো।
তবে নবদ্বীপের রাধারমণ বাগ সমাজবাড়িতে অবশ্য গরমে দেবতাকে ঠান্ডা পানীয় ভোগ দিতে অত তিথি নক্ষত্রের হিসাব করেন না। সেবক জনক দাস বলেন, ‘‘যখনই গরম পড়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা খাবার দেওয়া শুরু হয়ে যায়। এ জন্য আমরা তিথি নক্ষত্র বাছি না। আমাদের গরম করলেই বুঝতে পারি, এখানে আত্মবৎ সেবা হয়। অর্থাৎ নিজের মতো করে দেবতাকে সেবা পুজো করা।’ গরমে দেবতার নৈবেদ্যে আগে জায়গা করে নেয় টক জাতীয় খাবার। চাটনি, নানা ধরনের আচার প্রতিদিনের ভোগে দিতেই হয়। সঙ্গে মরসুমি ফল। পানীয়ের মধ্যে দিনের শুরুতে দেবতাকে দেওয়া হয় বিশেষ সরবত। আগের রাতে সাদা কাপড়ে মিছরি ভিজিয়ে রাখা হয়। পরদিন সকালে তাতে বিট লবণ, গোলমরিচ আর পাতি লেবু মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই সরবত। দিনের বেলা বারে বারে ওই সরবত দেওয়া হয় দেবতাকে। দুপরের পর থেকে সরবতের বদলে ডাব।
ও দিকে চৈত্রের শেষ বিকেলে সূর্যের বিয়াল্লিশ ডিগ্রির রক্তচক্ষুকে থোড়াই কেয়ার করে বছরের শেষ উৎসবে গাজনতলায় পা ফেলা দায়। বেচারাম ঢাকী তার প্রকান্ড ঢাকে ‘মাতন’ তুলতেই চড়ক গাছে চরকি পাক শুরু। জোড়ায় জোড়ায় সন্ন্যাসী পিঠে বঁড়শি গিঁথে হাত-পা ছড়িয়ে শূন্যে ভেসে গেল যেন। সেই দেখে শুকিয়ে কাঠ গলা ভেজাতে হন্যে হয়ে ‘ঠান্ডার’ খোঁজ। হাতের কাছেই মজুত ডাব থেকে লস্যি থাকলে কী হবে, দাম বেশ চড়া। ডাব ১৫ থেকে ২৫ টাকা সাইজ অনুসারে। লস্যি শুরু ২০ টাকা থেকে। বোতলবন্দি নরম পানীয় দামে কিন্তু নরম নয়। গলা ভেজাতে অগত্যা ভরসা সস্তার সোডা। সদর মফস্সলে এখন স্বয়ংক্রিয় সোডার মেশিনের ছড়াছড়ি। প্রতি গ্লাস মাত্র দশ টাকা।
দীর্ঘ দগ্ধ দিনে ভগবানের জন্য সরবতের তরিবত থাকলেও ভক্তের ভরসা কেবল সস্তার সোডা।