ঘোড়ার পিঠে। বহরমপুরে। ছবি: গৌতম প্রামাণিক
জেলা পুলিশের উদ্যোগে খান পাঁচেক হৃষ্ট-ঘোড়া ইতিমধ্যেই আনা হয়েছে রাজস্থান থেকে। বহরমপুরের পুলিশ লাইনে তোয়াজে থাকা সেই অশ্বকুল এখন পা ঠুকছে পয়লা ডিসেম্বরের অপেক্ষায়। শীতের সকালে জেলা পুলিশের সঙ্গেই ঘোড় সওয়ারির তালিম নিতে পারবেন অশ্ব-প্রেমী সাধারণেও। তবে তার জন্য গুনতে হবে মাসিক তিন হাজার টাকা। তিন মাসের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ শেষে মিলবে পাকাপোক্ত অশ্বারোহী হয়ে ওঠার সরকারি সংশাপত্র-ও।
কলকাতা পুলিশের তত্ত্বাবধানে থাকা মাউন্টেড পুলিশ উইং ছাড়া রাজ্যে আর কোথাও পুলিশের অধীনে ঘোড়া নেই। সেই হিসেবে মুর্শিদাবাদ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তবে, কলকাতার মাউন্টেড বা ঘোড়-সওয়ার পুলিশ শহরের প্রাণকেন্দ্র ময়দান এলাকায় টহলদারি চালায়। তাদের কাজ মাঠে ময়দানে খেলার সময় সমর্থকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়া। বড় কোনও খেলার টিকিট বিক্রির উন্মাদনা নিয়ন্ত্রণও তাদের কাজের অঙ্গ। তবে, এর বাইরে বিশেষ কোনও পরিস্থিতি ছাডা় ঘোড়-সওয়ার পুলিশের তেমন কোনও ভূমিকা নেই।
মুর্শিদাবাদের মাঠ ময়দানে তেমন কোনও খেল-উন্মাদনার নজির নেই। তা হলে, কলকাতা এবং রাজস্থান থেকে ঘোড়া বয়ে আনার কারণ নিয়ে তাই পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণের কপালের কৌতূহলী ভাঁজ পড়েছিল। জেলার পুলিশ সুপার কে শবরী রাজকুমার তার নিরসন করে বলছেন, ‘‘পুলিশকর্মীদের শরীর চর্চা একটা বাধ্যতামূলক বিষয়। সম্প্রতি তাঁদের যোগ ব্যায়ামের প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে। শরীরকে চাঙ্গা বা ‘ফিট’ রাখতে তাই পুলিশের উদ্যোগে ঘোড়-সওয়ারির প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। এতে মনের সতেজতাও বাড়বে। আবার পুলিশের সঙ্গেই ইচ্ছুক সাধারণ মানুষও ঘোড়ায় চড়া শিখলে জনসংযোগের একটা দরজাও খুলে যাবে।’’ তবে, আইন-শৃঙ্খলা সামাল দিতে মুর্শিদাবাদ পুলিশ এখনই ঘোড়-সওয়ার পুলিশ বাহিনী তৈরি করছে না। এটা সরকারি সিদ্ধান্ত। সে ব্যাপারে নবান্নের সম্মতি পেলে বিষয়টি নিয়ে ভাববে জেলা পুলিশ।
আপাতত, চোঁয়াপুরে প্রায় ৩০ বিঘা জমির উপরে যে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে সেখানেই ডিসেম্বর মাস থেকে ফুটবল অ্যাকাডেমির সঙ্গেই চালু হচ্ছে ঘোড়-সওয়ারির প্রশিক্ষণ। জেলা অবশ্য পুলিশ একা নয়, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে ওই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তার জন্য রাজস্থান থেকে এক প্রাক্তন সেনা প্রশিক্ষককেও নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। রবিবার, ‘মেঘদূত ঘোড়-সওয়ার স্কুল’ নামে ওই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেছেন জেলা পুলিশ সুপার। জেলা পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, ওই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যে কেউ প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। তালিমের জন্য মাসিক ভাতা, ১২ বছর বয়সীদের দু’হাজার টাকা। তার উর্ধ্বে মাসিক তিন হাজার। সঙ্গে ভর্তির জন্য এক কালীন হাজার টাকা। অন্তত ৩ মাস প্রশিক্ষণ নিলে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে শংসাপত্র।
হায়দরাবাদে জাতীয় পুলিশ অ্যাকেডেমিতে আইপিএস-ট্রেনিং’র সময়ে (ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস) ঘোড় সওয়ারি বাধ্যতামূলক। তবে জেলার এক পদস্থ কর্তা বলছেন, ‘‘প্রশিক্ষণ তো নিয়েছিলাম, কিন্তু চর্চার অভাবে সে সব কবেই ভুলে গিয়েছি। এখানে সেই সুযোগ পেলে ফের এক বার ঝালিয়ে নেওয়া যাবে।’’
জেলার বেশ কয়েকটি থানার উৎসাহী ওসি অবশ্য ঘোড়ার কদর করেন। এলাকা টহলদারির সময়ে তাঁরা যে ঘোড়ায় সওয়ার হন, এখবর নতুন নয়। জেলার আনাচ কানাচে সাধারণের মধ্যেও অশ্বারোহী হওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সাইকেল কিংবা মোটরবাইকের দাপটে তা ফিকে হয়ে এলেও ডোমকল, জলঙ্গি এলাকায় দু-একটি এলাকায় ঘোড়ায় চড়ার রেওয়াজ রয়েছে। দৌলতাবাদের হাজিডাঙার অধিকারী পরিবার সেই স্মৃতি এখনও হাতড়ে ফেরে।
অধিকারী পরিবারের সদস্য তথা বহরমপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুকুমার অধিকারী বলছেন, ‘‘বছর কুড়ি আগেও ঘোড়া পুষতাম। কিন্তু দেখভালের লোকের বড়ই অভাব। কলেজে পড়ার সময়ে ঘোড়া ছুটিয়ে এদিক-ওদিকে যেতাম। সেই সব দিন ফিরে এলে মন্দ কী!’’