Lockdown in India

ওই সাইকেলটা কোনও দিন বেচব না

বাড়ির উঠোনে হাসি ফোটাতে বাড়তি রুজির হাতছানিতে ওঁদের ঠিকানা ভিন প্রদেশে। কিন্তু লকডাউনের অনুশাসনে  রুজি তো গেছেই ঘরে ফেরাও ঝুলে ছিল সুতোর উপরে। দুর্বিষহ সেই প্রবাস কিংবা অনেক লড়াইয়ের পরে ফিরে আসার সেই গল্প বলছেন পরিযায়ী শ্রমিকেরা, শুনল আনন্দবাজাররোদ-বৃষ্টি, অন্ধকারকে পাশে নিয়ে ৬৫০ কিমি পথ পেরিয়ে পেয়েছিলাম নতুন জীবন।

Advertisement

লালন শেখ

শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২০ ০৫:০৫
Share:

প্রতীকী ছবি

কাজ হারিয়ে বসে আছি ঘরে, দিনের পর দিন বাড়ছে লকডাউনের সময়সীমা। আর সেই সঙ্গে খালি হচ্ছে পকেট। এমনকি যে মালিকের অধীনে কাজ করছিলাম এক সময় পাওনা টাকাটাও দিতে অস্বীকার করল সে। বুঝতে পারলাম আর উপায় নেই, ঘরে ফিরতে না পারলে ভিন দেশে না খেয়েই মরতে হবে।

Advertisement

শেষ পর্যন্ত কাজে যাওয়ার জন্য রাখা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম তিন বন্ধু। দু’টো সাইকেল তিন জনে পালা করে চালিয়ে শুরু হল এক নতুন যাত্রা। রোদ-বৃষ্টি, অন্ধকারকে পাশে নিয়ে ৬৫০ কিমি পথ পেরিয়ে পেয়েছিলাম নতুন জীবন।

প্রায় মাস তিনেক ধরে বসে খেতে খেতে পকেটটা প্রায় শূন্য হওয়ার জোগাড়। সাড়ে ৪০০ টাকা পকেটে পড়ে থাকতে দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারিনি। তিন বন্ধু মিলে আলোচনা করলাম কপালে যা আছে হবে, এ বার বেরিয়ে পড়ি। বার কয়েক ওই পথে বাসে যাতায়াত করায় রাস্তা চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি আমাদের। কিন্তু দু’টো সাইকেলে ৩ জন আরোহী নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। পকেটে সামান্য টাকা, ফলে বেশি খরচ করে কিছু খাবার দাবার কিনব সেই উপায়ও নেই। বাধ্য হয়ে বিস্কুট মুড়ি কখনও কখনও কলা, তরমুজ কিনে এই টানা পথ চলছি। অর্ধেক পথ এসেই নষ্ট হয়ে গেল একটা সাইকেলের চাকা। বুঝতে পারলাম, মানুষ যখন অসহায় হয় তখন তার ভাগ্যের চাকাও উল্টো পথে ঘোরে। রাতের অন্ধকারে ওই ঘটনা হওয়ায় মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল, কিছুটা পথ সাইকেল নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার ধারে যাকে দেখতে পেলাম জানতে চাইলাম সাইকেল সারাইয়ের দোকান কোথাও আছে কিনা।

Advertisement

শেষ পর্যন্ত কয়েক কিমি পথ হাঁটার পরে সন্ধান মিলল সাইকেল মেরামতির দোকানের। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেও নারাজ কাজ করতে। শেষ পর্যন্ত হাতে-পায়ে ধরে আড়াইশো টাকা দিয়ে টিউব বদলে আবার শুরু হলো যাত্রা। পেটে তখন চলছে ছুঁচোর কীর্তন। ভাবছি কোথাও খাবার পেলে কম পয়সায় ডাল-ভাত খেয়ে নেব। কিন্তু সে উপায়ও নেই, রাস্তার ধারের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ। বুঝে গেলাম কোনও উপায় নেই, এ ভাবেই চলতে হবে পথ। টানা তিন দিন তিন রাত চলেছি রাস্তায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার, ফাঁকা মাঠ। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এই রাস্তাটা হয়তো আমাদের শেষ রাস্তা। বুকটা কেঁপে উঠেছে রাস্তার পাশের ঝোপ ঝাড় জঙ্গল দেখে। ভয়ে রাতের অন্ধকারে সে রাস্তা পেরোতে গিয়ে কখনও কখনও তিন বন্ধু মিলে গান ধরেছি, আবার যখন শরীরটা আর চলেনি তখন রাস্তার পাশের দোকানের মাচায় একটু জিরিয়ে নিয়েছি। এলাকায় ফিরেও কাজ নেই, সংসার কিভাবে চলবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement