কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল। ডান দিকে, ফুলিয়া শিক্ষানিকেতন। —নিজস্ব চিত্র
যা হয় আর কি, পিঠোপিঠি বছর কয়েক ভাল ফল করার পরে নাক কুঁচকে অনেককেই বলতে শুরু করেছিলেন— আরে বাবা ভাল ছেলে ভর্তি নিলে ভাল ফল তো করবেই!
বেশ একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে স্কুলের লম্বা বেঞ্চির গায়ে হেলান দিয়ে প্রবীণ শিক্ষক বলছেন, ‘‘তা নিন্দুকেরা অমন বলে ভাই! সরকারি নিয়মের গেরোয়, কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে তো এখন ‘লটারি’র ভাগ্যে ছেলে-ভর্তি হয়, দুধ আর জলটা আগে থেকে বাছাই করার সুযোগ কোথায়?’’
সেই তেলে-জলে মিশে থাকা ছাত্রকুল নিয়ে এ বারও সেরার সেরা কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল। মাধ্যমিকে ওই স্কুল থেকেই এ বার দশম হয়েছে স্কুলের জিষ্ণু বিশ্বাস।
১৮৪৬ সালে পোস্ট অফিস মোড়ের প্রসাদরঞ্জন লাহিড়ীর বাড়িতে অস্থায়ী ভাবে, কৃষ্ণনগর গভর্ণমেন্ট কলেজের সঙ্গে একই ছাতার তলার শুরু হয়েছিল এই স্কুল। পরে সেখান থেকে ছিটকে গিয়ে প্রখ্যাত আইনজীবী মনমোহন ঘোষের বসত বাড়িতে স্থায়ী ভাবে শুরু সেই স্কুল। হালে, লেকে সে স্কুলে ভর্তি করতে না পেরে শহরের অনেকেই নাক কুঁচকে বলেন— ‘অমন ঝাড়াই বাছাই করে নিলে ভাল ফল হবে না!’’
২০১২ থেকে ২০১৪, মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিকেও টানা ভাল ফল করতে থাকে এ স্কুলের ছাত্রেরা। সেই স্কুলের রান্নাঘরে উঁকি মারতেই দেখা বাংলার শিক্ষক স্মরজিৎ মন্ডলের সঙ্গে। বলছেন, ‘‘স্কুলের পরিবেশের মধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভাল রেজাল্ট করার একটা মানসিকতা তৈরি হয়। তাদের মধ্যে একটা আকাঙ্খা তৈরি হয় ভাল ফল করার।’’
স্কুলের অন্য এক শিক্ষক বলছেন, ‘‘আমাদের স্কুলে শিক্ষকেরা ছাত্রদের ভাল ফল করানোর পিছনে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন। কোচ খাটলে প্লায়াররা তো ভাল খেলবেই!’’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক এস এম আমানুল্লা বলেন, ‘‘ছাত্রদের ‘স্পেশাল ক্লাস’ নেওয়া হয়। টিচার্স রুমের দরজাও ছাত্রের জন্য সব সময় খোলা।’’
তবে এর পরেও আছে একটা বিশেষ ব্যবস্থা। প্রতি বছর দু’টি সেকশন থেকে অন্তত ৩০ জন ছাত্রকে বেছে নেওয়া হয় যাদের মধ্যে সম্ভাবনা আছে। তাদের উপরে আলাদা নজরদারি চালানো হয়। তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়।
জেলায় এ বার নজর কেড়েছে আরও একটি স্কুল— ফুলিয়া শিক্ষা নিকেতন। ওই স্কুল থেকেই এ বার পঞ্চম হয়েছে স্কুলের শৌভিক মন্ডল। তেমন কৌলিন্য না থাকলেও এ বার তাদের ফলজেলার অন্য স্কুলগুলিকে চমকে দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিক ভাবে স্কুলের সর্বোচ্চ নম্বর ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। ফলে একটু একটু করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা। এ বছর তাদের সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে।
জিষ্ণু বিশ্বাস ও সৌভিক মণ্ডল।
১৯৫২ সালে বিপ্লবী রসময় শূরের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এই স্কুলের। তিনি নিজেই ছিলেন প্রথম প্রধানশিক্ষক। আর এক বিপ্লবী গোপাল চক্রবর্তীর নামও জনিয়ে আছে এই স্কুলের সঙ্গে। তিনিও প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন বেশ কিছু দিন। উদ্বাস্তু প্রধান এই ফুলিয়ায় শিক্ষার প্রসার ঘটাতেই সে দিন এই স্কুলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেই থেকেই মূলত উদ্বাস্তু পরিবারের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ক্রমশ উপরের দিকে উঠে আসার লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সকলে। বেশ কয়েক বছর ধরে তার ফলও মিলতে শুরু করে দিয়েছেল হাতে নাতে। মেধা তালিকার প্রথম দশে না থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে ভাল ফল করার একটা ধারাবাহিকতা ছিল তাদের।
স্কুলের ইংরাজির শিক্ষক অনিন্দ্য মোদক বলেন,‘‘আমাদের শিক্ষকদের প্রত্যেকের একটা ভালো কিছু করে দেখানের তাগিদ রয়েছে। ফলও পেয়েছি সে করাণেই।’’ ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা স্বপ্না মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘প্রচুর ছাত্রছাত্রী থাকলেও শিক্ষকেরা তাদের মধ্যে থেকে সম্ভাবনাময় ছাত্রদের চিহ্নিত করেন। তাদের উপরে নজর রাখা হয়। নিয়মিত তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়। তারই ফল মিলছে।’’