সতর্কতা কেবল বিজ্ঞাপনেই। মাস্ক ছাড়াই অবাধ যাতায়াত। কৃষ্ণনগরে। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য
গত দু’মাস পরিস্থিতি যেমন ছিল তার থেকে অবস্থাটা এখন একেবারে উল্টে গিয়েছে।
করোনার আবহে লকডাউন শুরু হওয়ায় কাজকর্ম হারিয়ে দলে-দলে যে কোনও ভাবে বাড়ি ফেরার জন্য মরিয়া ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিকেরা। কিন্তু ‘অনলক-ওয়ান’ শুরু হতেই ফের ভিন রাজ্যের কর্মক্ষেত্রে ফেরার জন্য উতলা হয়ে পড়েছেন অনেকেই। তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসার জন্য অনেকে আবার আফশোসও করছেন। যত দ্রুত ভিন রাজ্যের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়া যায় সেই চেষ্টা শুরু করেছেন। যাঁরা সেই সময় আসতে পারেননি, ভিন রাজ্যেই আটকে ছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আর বাড়ি ফিরতে চাইছেন না, কারণ সেখানে আবার কাজ পেতে শুরু করেছেন ও বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছেন।
যে সব শ্রমিক কেরল, মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর মতো বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাড়ি ফিরেছেন তাঁদের অনেকেই এখন জেলায় একশো দিনের কাজে নিযুক্ত। তাতে ৬৬ ঘন ফুট মাটি কাটলে দিনে ২০৪ টাকা মেলে। শ্রমিকদের দাবি, ভিন রাজ্যের কাজে তাঁদের দৈনিক রোজগার ৬০০-৭০০ টাকা ছিল। এই বাড়তি টাকার জন্যও তাঁরা নিজের রাজ্যে একশো দিনের কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফের অন্য রাজ্যে যেতে চাইছেন এবং সেখানে এখনও তাঁদের পরিচিত যে শ্রমিকেরা রয়ে গিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
হোগলবেড়িয়ার ইকবাল মণ্ডল যেমন লকডাইনের সময় ফিরতে পারেননি। শনিবার ফোনে কেরলের এর্নাকুলাম থেকে জানান, আগে করিমপুর ও আশেপাশের এলাকার প্রায় ১২০ জন শ্রমিক একসঙ্গে নির্মাণশিল্পে কাজ করতেন। লকডাউনে প্রায় আশি শতাংশ শ্রমিক বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। এখন আবার কেরলে নতুন করে শুরু হয়ে গিয়েছে। সেখানে শ্রমিকের সংখ্যা কম থাকায় তাঁরা যে ক’জন রয়েছেন তাঁদের মজুরি বেড়ে গিয়েছে।
একই কথা জানালেন করিমপুরের অলোকেশ বিশ্বাস। তাঁর কথায়, “আমরা করিমপুর ও বর্ধমানের প্রায় ৬৫ জন কেরলে কাজ করছি। কেউ আর এখন বাড়ি যেতে চাই না। রোজগার এখন ভাল হচ্ছে। সকলেই বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছি। এখন মনে হচ্ছে, লকডাউনের মধ্যে কাজ হারিয়েও বাড়িতে না গিয়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”
ফিরে আসা শ্রমিকদের অনেককেই একশো দিনের কাজে নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন সূত্রের খবর, গত এক মাসে করিমপুর ১ ও ২ ব্লকে প্রতিদিন প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ একশো দিনের কাজ করছেন। তাঁদের প্রায় পঁচিশ থেকে তিরিশ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক। যাঁদের জবকার্ড ছিল না তাঁদের অনেককেই নতুন কার্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মজুরির নিরিখে একশো দিনের কাজের থেকে ভিন রাজ্যে ফের কাজে যাওয়াকে বেশি লাভজনক মনে করছেন বহু শ্রমিক।
যেমন করিমপুরের মিনারুল শেখ। এক মাস আগে তিনি কেরল থেকে ফিরেছেন। চোদ্দো দিন কোয়রান্টিন কেন্দ্রে থাকতে হয়েছে। তার পরেও প্রায় ১৫ দিন হতে চলল বাড়িতে বসে আছেন। কোনও কাজ পাননি। বললেন, ‘‘বাড়ি এসে খুব আফশোস হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওখান থেকে এ ভাবে না এলে রোজগার বন্ধ হত না। তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘এখানে ১০০ দিনের কাজে প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি দু’শো টাকা আয় হবে। কেরালায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় আটশো টাকা রোজগার হয়।” রামনগরের জার্মান শেখের কথায়, ‘‘ছেলে কেরলেই ছিল। লকডাউনে ফেরেনি। মাঝে কয়েক মাস কাজ না-থাকায় বাড়ি থেকে ওর জন্য ছয় হাজার টাকা পাঠাতে হয়েছিল। কিন্তু এখন সে আবার কাজ করে টাকা পাঠাতে শুরু করেছে। আমরাও মনে করছি, ও ওখানে থেকে গিয়ে ঠিক করেছে।”