রোগের ঘরে ঘোগের বাসা

সেই বিশ্বাসেই এ বার ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে। চিকিৎসক আসছেন না, শয্যা নেই, সেই সঙ্গে রক্ত-স্যালাইন-ওষুধের ছিটেফোঁটা উধাও, এমনতরো অভিযোগগুলো আসছিলই।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ ০০:৫৮
Share:

ভ্যারিকশার ঝাঁকুনি, দীর্ঘ বাসযাত্রার ধকল কিংবা খোলা মিনিডর ট্রাকের উলম্ফন— বুক ভরা ভরসা ছিল যাত্রাপথটুকু যাই হোক, হাসপাতালে পৌঁছন গেলে চিকিৎসা পাকা।

Advertisement

সেই বিশ্বাসেই এ বার ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে। চিকিৎসক আসছেন না, শয্যা নেই, সেই সঙ্গে রক্ত-স্যালাইন-ওষুধের ছিটেফোঁটা উধাও, এমনতরো অভিযোগগুলো আসছিলই। নদিয়া কিংবা তার গা ঘেঁষা মুর্শিদাবাদের প্রান্তিক এলাকার গ্রামীণ হাসপাতালগুলি থেকে এ বার আসতে শুরু করেছে বহিরাগতের উৎপাতের অবাঞ্ছিত খবরও। সেই তালিকায় যেমন, এলাকার বাহুবলীরা রয়েছে তেমনই অভিযোগের আঙুল উঠেছে খোদ চিকিৎসক কিংবা থানার ওসি-র বেলেল্লাপনারও।

অত্যন্ত হতাশ গলায় তাই নদিয়ার এক শীর্ষ স্বাস্থ্যকর্তা বলছেন, ‘‘এ আর পেরে ওঠা যাচ্ছে না। নেই-এর সঙ্গে এই বহিরাগতের উৎপাত একেবারে জেরবার করে তুলেছে।’’ যার জেরে ভুগছেন দূর-দূরান্ত থেকে হাসপাতালে চিকিৎসার ভরসায় আসা গ্রামীণ রোগীরা। দিন কয়েক আগে, এক রোগীর হাতে স্যালাইনের সূঁচ ফোটানোর সময় ‘রক্ত ঝরে না যেন’, শাসিয়ে খোলা রিভলভার নিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল যে যুবক, পুলিশ তার টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। তবে বহিরাগতের এমন অপার দৌরাত্ম্যে পরের দিনই হাসপাতালে আসা বন্ধ করেছিলেন চিকিৎসক। আজিমগঞ্জের সে হাসপাতাল এখন চিকিৎসকহীন। সপ্তাহ ঘোরার আগেই লাগোয়া জিয়াগঞ্জ হাসপাতালে এক রোগী মৃত্যুর পরে একই ভাবে গাফিলতির অভিযোগ তুলে নার্স-চিকিৎসকদের ‘শাস্তি’ দিয়েছিল স্থানীয় গ্রামবাসীদের একাংশ। একই রাস্তায় হেঁটে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে গিয়েছিলেন ওই হাসপাতালের এক চিকিৎসক। সে হাসপাতালও রোগগ্রস্ত অবস্থায়। নদিয়া জেলা সদর হাসপাতালে মহিলা ওয়ার্ডে এক প্রসূতির শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠার পরে গ্রামীণ মানুষ এখন সেখানে স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে সে হাসপাতালে যেতেই ভয় পাচ্ছেন। এই আবহে দিন কয়েক আগে, নবগ্রামের হাসপাতালে ‘দৌরাত্ম্য’ চালিয়েছেন তিন সরকারি কর্তা, অভিযোগ উঠেছে এমনও। এই অবস্থায় দু’জেলার অধিকাংশ প্রান্তিক হাসপাতাল এখন রীতিমতো চোখে পড়ার মতো ধুঁকছে।

Advertisement

বেসরকারি হাসপাতালের খরচের খাঁইয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁদের অধিকাংশের নেই। ভরসার নাম যে সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র সেখানেও এই উটকো সমস্যা গরিব গুর্বো গ্রামবাসীদের এখন আতান্তরে ফেলেছে। আজিমগঞ্জ হাসপাতালের ঘটনা ভরা বিস্ময় নিয়ে দেখেছেন যে নার্স, তিনি বলছেন, ‘‘সন্ধে হলেই প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি হয়ে ওঠে বহিরাগতদের উৎপাতের আখরা। তবে সে দিন যা হয়েছিল তার পরে আর কাজ করতে ভরসা হয় না!’’

স্বাস্থ্য কর্মীদের সেই ভয় আড়াল করতে কোনও রকম নিরাপত্তা অবশ্য জেলা স্বাস্থ্য দফতর দিতে পারেনি। মুর্শিদাবাদের এক স্বাস্থ্য কর্তা বলেন, ‘‘অভিযোগ মিলছে বহু জায়গা থেকেই। কিন্তু সত্যি বলতে তা সামাল দেওয়ার কোনও পরিকাঠামো জেলা স্বাস্থ্য দফতরের নেই।’’ পরিণতিতে যে রোগী এবং তাদের বাড়ির লোকেরাই ভুগছেন সব থেকে বেশি তা মেনে নিচ্ছেন নদিয়া জেলা স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তা। বলছেন, ‘‘কী বলব বলুন তো, এতে ক্ষতি যে সাধারণ রোগীদের তা তো বুঝতেই পারছেন। কিন্তু আমাদের হাত-পা বাঁধা!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement