অস্ত্রের কারবার যে চলছিল, তা ভালই জানতেন সগুনার বাসিন্দারা। সগুনার অস্ত্রভাণ্ডার থেকে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল আগ্নেয়াস্ত্র-বোমা। এমনকী, কল্যাণী থেকে গঙ্গা পার হয়ে তা ছড়িয়ে যাচ্ছিল হুগলীর বিভিন্ন এলাকায়। কিন্তু এ নিয়ে মুখ খোলার সাহস দেখাননি কেউ। কারণ, তার পরিণতি কী হবে, সেটাও অনুমান করতে পেরেছিলেন সকলেই।
আর সেই কারণেই সগুনার রীতিমতো জনবহুল এলাকায় অবাধে চলছিল অস্ত্রের কারবার।
শুক্রবার কল্যাণীর সগুনার একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা এবং প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে সিআইডি। গত বছর অগস্টেও এই সগুনার ১ নম্বর লিচুতলা থেকেই প্রচুর অস্ত্র-বোমা-বারুদ বাজেয়াপ্ত উদ্ধার হয়েছিল। স্থানীয় স্কুলের সামনের একটি ক্লাবঘরই ছিল অস্ত্রভাণ্ডার। সে বার সিআইডি সগুনা এলাকার ত্রাস প্রশান্ত বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার করা হয় তার কারবারে জড়িত আরও সাত জনকে। জনবহুল এলাকার ক্লাবঘরে এমন অস্ত্রভান্ডার দেখে চোখ কপালে উঠেছিল গোয়েন্দা অফিসারদের।
সেই ঘটনার পর থেকে প্রশান্ত হাজতে। কিন্তু, বন্ধ হয়নি তার অস্ত্রের কারবার। জেল থেকেই সে ফের কারবার শুরু করে। গতবার সিআইডি প্রশান্ত-সহ আট জনকে গ্রেফতার করলেও তার মূল শাগরেদ রাজীব দে-কে ধরতে পারেনি। জেলবন্দি প্রশান্তের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এ বার রাজীবই হয়ে ওঠে কারবারের পাণ্ডা। এলাকার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে তার ভালই যোগাযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশান্তের পুরনো খরিদ্দারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে ফের চালু করে অস্ত্রের কারবার।
সিআইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, এর আগে ওয়ান শটারগুলি এলাকাতেই তৈরি করা হতো। এ বার কিন্তু সে আর ওই কাজ করেনি। মূলত মালদহ-মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ওয়ান শটারগুলি আনা হত। তবে বোমা তৈরি হত সগুনার ২ নম্বর লিচুতলার ওই বাড়িটিতেই। তার পর সেই ওয়ান শটার আর বোমাগুলো যেত মূলত ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায়। বোমা তৈরির কাজে নাবালকদেরও ব্যবহার করত রাজীব। সিআইডি রানাঘাটের হিজলীর নতুনগ্রামের কার্তিক দাস নামে এক জনকে গ্রেফতার করেছে। তার বয়স ১৮। সে-ও বোমা তৈরি করত। ফরমায়েশ মতো বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র সরবরাহ করত। প্রশান্তর নির্দেশ মতো তার পুরনো খরিদ্দারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বছরখানেক ধরে কারবার চালাচ্ছিল রাজীব। সম্প্রতি সে নিজে থেকে কিছু নতুন জায়গায় কারবার শুরু করে। সেখান থেকেই বিপদ ঘনায়। সেই সূত্র ধরে সিআইডির নজরে পড়ে সে।
অন্য দিকে, প্রায় প্রতি দিনই জেলে গিয়ে প্রশান্তর সঙ্গে রাজীবের দেখা করাও নজর এড়ায়নি সিআইডির। রাজীবের ফোন কলের উপর নজরদারি শুরু করে তারা। তার পরেই রাজীবের অস্ত্রের কারবার নিয়ে নিশ্চিত হয় গোয়েন্দা কর্তারা।
ফের অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় আতঙ্কিত বাসিন্দারাও। স্কুলপড়ুয়াদের হাতে পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে ওয়ান শটার। স্থানীয় এক ছোট ব্যবসায়ী জানালেন, রাজীবদের এমনই প্রভাব যে, তাদের বিরুদ্ধে গেলে এলাকায় থাকা যাবে না। সেই জন্য এক রকম বাধ্য হয়েই তাঁদের মুখ বন্ধ রাখতে হয়।
কিন্তু প্রশাসন কী করছে?
তৃণমূলের পার্টি অফিসের নাকের ডগায় এমন একটি ঘর থেকে দিনের পর দিন অস্ত্রের কারবার চললেও তাদের নেতা-কর্মীরা নাকি কিছুই জানতেন না। কল্যাণী ব্লক তৃণমূলের সভাপতি দেবাশিস বিশ্বাস বলেন, ‘‘রাজীবকে আমি চিনিই না। সে আমাদের পার্টির কেউ নয়। আর পার্টি অফিস খোলা থাকে রাত সাড়ে ন’টা-দশটা পর্যন্ত। তার পর ওখানে কিছু হলে তা পার্টির ছেলেদের জানার কথাও নয়।’’