কৃমির প্রকোপে কম দুধ, প্রমাণে সেরার শিরোপা

অতি তুচ্ছ কয়েক’টি কৃমির ছোবলে মাসে ৮-১০ কিলোগ্রাম দুধ কম পাওয়া যায়। গরুর স্বাস্থ্যও ভাঙতে থাকে। বংশ পরম্পরায় গো-পালন করে এলেও এই তথ্যটি জানা ছিল না বহরমপুর শহর লাগোয়া রঘুনাথতলা, হরিদাসমাটি, কৃষ্ণমাটি-সহ বেশ কয়েক’টি গ্রামের গো-পালক রমেন ঘোষ, নিত্যানন্দ ঘোষ এবং বীরু ঘোষদের।

Advertisement

অনল আবেদিন

শেষ আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:১৫
Share:

পড়ুয়াদের সঙ্গে স্কুল শিক্ষক দীপঙ্কর রায়।—নিজস্ব চিত্র

অতি তুচ্ছ কয়েক’টি কৃমির ছোবলে মাসে ৮-১০ কিলোগ্রাম দুধ কম পাওয়া যায়। গরুর স্বাস্থ্যও ভাঙতে থাকে। বংশ পরম্পরায় গো-পালন করে এলেও এই তথ্যটি জানা ছিল না বহরমপুর শহর লাগোয়া রঘুনাথতলা, হরিদাসমাটি, কৃষ্ণমাটি-সহ বেশ কয়েক’টি গ্রামের গো-পালক রমেন ঘোষ, নিত্যানন্দ ঘোষ এবং বীরু ঘোষদের।

Advertisement

এ বারে হাতে-কলমে সেই তথ্য প্রমাণ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বহরমপুর শহরের কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলের অষ্টম শ্রেণির পাঁচ পড়ুয়া— সম্প্রীত সরকার, শেখ হাসান, শুভঙ্কর রায়, শতরূপ সরকার এবং দেবাঞ্জন গুছাইত। এই সুবাদে ‘চিল্ড্রেনস সায়েন্স কংগ্রেস’ আয়োজিত রাজ্যস্তরের ‘বিজ্ঞান মডেল’ প্রতিযোগিতায় সেরার শিরোপা জিতে নিয়েছে পড়ুয়ারা।

কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ আয়োজিত ২৭ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ দিনের সর্বভারতীয় মডেল প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়ার জন্যও মনোনীত হয়েছে খুদেদের মডেলটি। দলনেতা হিসাবে অষ্টম শ্রেণির দেবাঞ্জন গুছাইত মডেল নিয়ে চলতি মাসের শেষে যাচ্ছে চণ্ডীগড়ে। এই দলের মেন্টর-শিক্ষক দীপঙ্কর রায় জানান, সরকারি নিয়ম মেনে মডেল নিয়ে শুধু দলপতি চণ্ডীগড় যাবে ঠিকই, কিন্তু প্রকল্পটি ওই পাঁচ পড়ুয়ার মিলিত চেষ্টার ফসল। জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক দীপঙ্করবাবু জানান, চণ্ডীগড়ের প্রদর্শনীতে প্রকল্পটির উন্নততর উপস্থাপনার জন্য কলকাতার নিতিকা ডনবস্কো স্কুলে গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ৩ দিনের কর্মশালায় দেবাঞ্জনকে প্রশিক্ষণ দেবেন যাদবপুর ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞেরা।

Advertisement

এমন একটি প্রকল্পের কথা খুদেদের মাথায় এল কী করে?

দেবাঞ্জনের কথায়, ‘‘গোয়ালারা মাঝে মাঝেই বলত এত খইল-গুড় খেতে দিই, সবুজ ঘাস দিই তবুও কেন দুধ কমছে বুঝতে পারছি না!’’ এই প্রশ্ন নিয়ে দীপঙ্করবাবুর কাছে যেতে তিনি হাতে কলমে প্রমাণ করার কথা বলেছিলেন। সেই প্রমাণই রেখেছে ওই পড়ুয়ারা। কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুল থেকে আধ কিলোমিটার দূরে ‘পলিক্লিনিক’ নামের পশু হাসপাতাল। সেখানে গিয়ে পড়ুয়ারা পশু চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে। জেনে নেয় দুধের উৎপাদন কমার নানা কারণ। আর তার মধ্যে অন্যতম ছিল কৃমির উপদ্রব। মনে ধরে কারণটি।

Advertisement

এরপরের ধাপে বহরমপুর শহর লাগোয়া রঘুনাথতলা, হরিদাসমাটি, কৃষ্ণমাটি-সহ কয়েক’টি গ্রামের ১০০ গরু নির্বাচন করা হয়। দেবাঞ্জন জানায়, গত জুন থেকে অগস্ট পর্যন্ত পঞ্চাশটি গাভীকে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। বাকি গরুগুলিকে সেই ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়নি। পরে হিসেব করে দেখা যায়, কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো গরুগুলির অন্য গরুগুলির তুলনায় মাসে ৮ থেকে ১০ কিলোগ্রাম বেশি দুধ দিয়েছে।

দীপঙ্করবাবু জানান, বর্ষায় শামুক-গুগলি ইত্যাদির মধ্যে কৃমি থাকে। তাই প্রকল্পের জন্য বর্ষাকালকেই বাছা হয়েছিল। তিনি জানান, একটি কৃমিনাশক ট্যাবলেটের দাম মাত্র চার-পাঁচ টাকা। সরকারি পশু হাসপাতালে এই ট্যাবলেট বিনামূল্যেও পাওয়া যায়। মাসে অন্তত এক বার কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ালে দুধের উৎপাদন বাড়ে। গবাদি পশুর স্বাস্থ্যও ভাল থাকে। সেটাই হাতেকলমে প্রমাণ করা হয়েছে।

কৃমিতে কমেছে দুধ, তা মানছেন রঘুনাথতলার রমেন ঘোষ। প্রবীণ এই ব্যক্তির কথায়, ‘‘আমরা চোদ্দো পুরুষের গোয়ালা। আর আমাদেরই কিনা এই বয়সে এসে কয়েক’টা পুঁচকে ছেলের কাছ থেকে গরু পোষা আর দুধের উৎপাদন বাড়ানো শিখতে হল? এক্কেবারে নাক কাটা গেল!’’ এমনটা মানছেন আরও অনেকেই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement