ধানের দামে চোখে আঁধার চাষির

সরকারি দাম থেকে যায় সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে। চাষিকে ধান বিক্রি করতে হয় তার চাইতে ঢের কম দামে। এ বারও সদ্য-ওঠা আমন বিক্রি করতে গিয়ে বিপুল লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা। গত ২০১৪-’১৫ আর্থিক বছরে কেন্দ্র সরকার কুইন্টাল প্রতি ধানের দাম ধার্য করেছিল ১৩৬০ টাকা। চলতি আর্থিক বছরে সেই দাম ঘো‌ষণা করা হয়েছে কুইন্টাল প্রতি ১৪১০ টাকা, জানাচ্ছেন প্রশাসনের কর্তারা। কিন্তু চাষিদের অভিযোগ, সরকার দাম বেঁধে দিয়েই খালাস।

Advertisement

কৌশিক সাহা

শেষ আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০১৫ ০১:৫৮
Share:

সরকারি দাম থেকে যায় সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে। চাষিকে ধান বিক্রি করতে হয় তার চাইতে ঢের কম দামে। এ বারও সদ্য-ওঠা আমন বিক্রি করতে গিয়ে বিপুল লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা।
গত ২০১৪-’১৫ আর্থিক বছরে কেন্দ্র সরকার কুইন্টাল প্রতি ধানের দাম ধার্য করেছিল ১৩৬০ টাকা। চলতি আর্থিক বছরে সেই দাম ঘো‌ষণা করা হয়েছে কুইন্টাল প্রতি ১৪১০ টাকা, জানাচ্ছেন প্রশাসনের কর্তারা। কিন্তু চাষিদের অভিযোগ, সরকার দাম বেঁধে দিয়েই খালাস। এখনও ধান কিনতে নামেনি সরকার। ফলে চাষিদের ভরসা সেই ফড়ে, নইলে স্থানীয় ব্যবসায়ী। তারা সরকারের ধার্য করা দামের থেকে অর্ধেক দামে ধান বেচতে বাধ্য হচ্ছেন। কুইন্টাল প্রতি ধান বিকোচ্ছে ৭৬০ থেকে ৭৭০ টাকায়। ফলে চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
চাষিরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সে কথা মানছেন এলাকার আড়তদাররাও। এক আড়ত ব্যবসায়ীর কথায়, ‘‘চালকল মালিকদের কাছ থেকে আমরা ধানের দাম কম পাচ্ছি। তাই চাষিদের কাছ থেকে ন্যায্য দরে ধান কিনতে পারছি না।’’ তিনি জানান, কুইন্টাল প্রতি ৭৭০ টাকা দামে চাষিদের কাছে ধান কেনা হচ্ছে। কারণ, চালকল মালিকরা আড়তদারদের কুইন্টাল প্রতি ৮৩৩ টাকা দাম দিচ্ছে। এক কুইন্টাল ধান চালকল পর্যন্ত নিয়ে যেতে খরচ হয় ৫১ টাকা। তাই তাঁরা চাষিদের কাছে থেকে ঠিক দামে ধান কিনতে পারছেন না, জানাচ্ছেন ওই আড়তদার।
মুর্শিদাবাদের চালকল মালিকদের সংগঠন সহ-সম্পাদক রঞ্জিতকুমার দত্ত বলেন, ‘‘চাষিরা যে দাম পাচ্ছেন না, তাতে আমরা সত্যিই ব্যথিত। কিন্তু বাজারে চাল বেশি থাকায় এখন যে আমন ওঠে তা গত বছর এগারোশো টাকা কুইন্টালে বিক্রি হলেও এ বারে দাম উঠেছে আটশো টাকা। তাই এর চেয়ে বেশি দাম দিতে পারছি না।’’

Advertisement

কেন বাজার এত খারাপ? ধনেখালির ধান ব্যবসায়ী দেবু দাস বলেন, ‘‘গত বারের ধানের প্রায় ১৫ শতাংশ অবিক্রীত থেকে গিয়েছে। তার উপর আবার ধান উঠল। স্বভাবতই দাম কমছে।’’ তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ধানের ৬০ কেজি বস্তা ৪৮০ টাকায় কিনেছেন।

একেই এ বছর শ্রাবণে এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি হওয়ায় বিপাকে পড়েছিলেন চাষিরা। বন্যার জল নামার পর চাষিরা অতি কষ্টে আবার চাষ করেছিলেন। খরচ, পরিশ্রম, সবই হয়েছে অনেক বেশি। তার উপর দাম না মেলায় পথে বসার উপক্রম হয়েছে চাষিদের। এক বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করতে প্রায় সাত হাজার টাকা খরচ হয়। ফলন ভাল হলে বিঘা প্রতি ধান হয় ছয় কুইন্টাল। চলতি বাজার দরে ওই ধান বিক্রি করলে চাষি পাচ্ছেন মেরেকেটে সাড়ে চার হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘা প্রতি ধান চাষির প্রায় আড়াই হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

Advertisement

চাষিদের অভিযোগ, একই অবস্থা বোরো চাষের ক্ষেত্রেও। এ বার বোরো চাষে ভাল ফলন হলেও আশানুরূপ দর মেলেনি। কান্দি এলাকার চাষি বাদল মণ্ডল ও নারায়নচন্দ্র গুঁই বলেন, “বোরো ধানে বিঘাপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা করে ক্ষতি হয়েছে। আবার আমন ধান চাষ করেও লোকসান হল।’’

জেলার শস্যগোলা বলে পরিচিত কান্দি মহকুমার বেশির মানুষের জীবিকাই হল কৃষি। মহকুমার মধ্যে ব়ড়ঞা ব্লকে আবার সবচেয়ে বেশি ধান চাষ হয়। চলতি বছরে কেবল বড়ঞা ব্লকেই প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছিল। জুন-জুলাই নাগাদ রোয়া হয়েছিল আমনের চারা। সেই ধান এখন উঠছে।

Advertisement

চাষিদের দাবি, চাষ করতে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। ধান উঠতেই ঋণ শোধ করার জন্য পাওনাদারেরা তাগাদা দিচ্ছ‌েন। কিন্তু ধানের দাম না মেলায় ঋণ শোধ করতে পারছেন না। ফলে কোনও রকমে অভাবী বিক্রি করে মহাজনদের টাকা দিতে মরিয়া চাষিরা।

এই পরিস্থিতি অবশ্য পাশের জেলা নদিয়াতেও। শান্তিপুর একটি ফার্মার্স ক্লাবের সম্পাদক তথা কৃষক শৈলেন চণ্ডী জানান, যাঁদের ধান বাড়িতে মজুত করার ক্ষমতা নেই, তাঁরা জলের দামে ফড়েদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। করিমপুর কৃষি কল্যাণ সমিতির সম্পাদক বিশ্বনাথ বিশ্বাস জানান, আমন ধান উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু সরকারের তরফে ধান কেনা শুরু না হওয়ায় চাষিরা অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘‘এখন আমন ধানের দাম হওয়ার কথা ছিল কুইন্টাল প্রতি ১৮০০ টাকা। অথচ চাষিরা ফড়েদের কাছে বিক্রি করছেন মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়।’’

মুর্শিদাবাদ জেলার খাদ্য নিয়ামক দেবমাল্য বসু বলেন, “কেন্দ্র থেকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকার ওই দামে ধান কেনার জন্য এখনও পর্যন্ত কোনও নির্দেশিকা জারি করেনি। তাই আমরা ক্যাম্প করে ধান কিনতে পারছি না।’’

কবে সরকার ধান কেনা শুরু করবে? খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জানিয়েছেন, ধান ওঠা সবে শুরু হচ্ছে। ডিসেম্বরের গোড়ার আগে ধান কিনতে নামবে না সরকার। যা থেকে স্পষ্ট, গোটা নভেম্বর মাসটাই বাজারের ভরসায় থাকতে হবে চাষিদের।

ব্যবসায়ীদের একাংশ জনান্তিকে জানালেন, বাংলাদেশে চোরাপথে বেশ কিছু চাল যেত। খাগড়াগড় কাণ্ডের পর নিরাপত্তার কড়াকড়িতে অনেকটাই কমে গিয়েছে। তার ফলেও এ রাজ্যে চালের দর কম।

বর্ধমানের সহ কৃষি অধিকর্তা পার্থ ঘোষ বলেন, ‘‘এখন যে ধান উঠছে, সেটা প্রধানত লাল স্বর্ণ। মোটা চাল হওয়ায় বাজারে চাহিদা কম। মূলত সরকারই নানা প্রকল্পের জন্য এই চাল কেনে।’’ তাই বাজারে ভাল দাম মিলছে না।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement