গত বছরের তুলনায় ফলন বেড়েছে। মাঠ ভরেছে সবুজে। স্বভাবতই চাষির মুখে হাসি ফোটার কথা। কিন্তু হাসি দূর উল্টে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘিরে ধরেছে তাঁদের।
প্রচুর ফলন হওয়ায় সব্জির দাম পড়তে শুরু করেছে। দিন যত যাবে সেই দাম আরও পড়বে বলে আশঙ্কা তাঁদের। সেক্ষেত্রে লাভের মুখে দেখা তো দূর চাষের খরচটুকু উঠবে কি না, ঋণ শোধ করতে পারবেন কি না সেই চিন্তায় ঘুম ছুটেছে তাঁদের।
সব্জি চাষে রাজ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে নদিয়া জেলা। বিশেষ করে শীতের সব্জি। মাঠের পর মাঠ এখন সিম, মুলো, পালং, ফুলকপি, বাঁধাকপিতে ভরে গিয়েছে। সব্জির বাজার এখন উপচে পড়ছে সেই সব্জিতে। কিন্তু দাম মিলছে কই। এক প্রকার জলের দামে বিকিয়ে দিয়ে আসতে হচ্ছে সেই সব্জি। পরিস্থিতি এমনই যে গতবারের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ দামে ফসল বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিলেন হাঁসখালির চাষি সুনীল ঘোষ। তিনি জানান, গতবারে তিন বিঘে জমিতে সব্জি চাষ করেছিলেন। লাভের মুখ দেখায় এ বার তিনি প্রায় চার বিঘা জমিতে সব্জির চাষ করেছেন। কিন্তু সব্জির দাম কমায় মাথায় হাত পড়েছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘‘স্থানীয় বা কলকাতার বাজারে সব্জি বিক্রি করতে যাই। কিন্তু কোনও বাজারেই সব্জির দাম মিলছে না। গতবারের তুলনায় কোনও সব্জির দাম অর্ধেক। কোনওটি আবার তিন ভাগের এক ভাগ।’’
তাঁর আক্ষেপ, ‘‘চাষিদের মধ্যে হাহাকার পড়ে গিয়েছে। ফড়েরা যা দাম দিচ্ছে সেই দামেই সব্জি বিক্রি করতে হচ্ছে।’’ সব্জি রেখে দেওয়া যায় না। স্থানীয় এলাকায় কোনও কোল্ড স্টোরেজ নেই। তাই সব্জি কিছু দিন রেখে দিয়ে উপযুক্ত দামের অপেক্ষায় থাকবেন সে সুযোগও নেই।
চাষিরা জানান, গত বছর যে পটল এই সময়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে সেই পটল এখন বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে ১০ টাকা দরে। বেগুনের দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি। এখন তার দাম ৪ থেকে ১০ টাকার মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। গত বছর এই সময় কাঁচালঙ্কা বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা কেজি। এখন বিকোচ্ছে ৬ থেকে ১০ টাকা কেজি। একই অবস্থা ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালং, মুলোর মতো সব্জির।
নদিয়ার যে ক’টি ব্লকে প্রচুর শীতের সব্জি উৎপন্ন হয় তার মধ্যে রানাঘাট-২ ব্লক অন্যতম। ব্লকের কৃষি আধিকারিক জেসমিন হক জানান, অতি বৃষ্টি বা বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে চাষিরা প্রাক-রবি মরশুমের ফসলের দাম ভাল পেলেও নতুন শীতের ফসলের দাম একদম পাচ্ছেন না। তার প্রধান কারণ, ফসলের অতিরিক্ত উৎপাদন। চাহিদার থেকে অনেক বেশি সব্জি বাজারে চলে আসছে। তেহট্টের বেতাইয়ের চাষি মোজাম শেখের কথায়, ‘‘এ বারে এত উৎপদন হয়েছে যে দাম গিয়ে তলানিতে ঠেকেছে। বেগুন চাষের জন্য যে ঋণ নিয়েছি তা শোধ করতে পারব কি না জানি না।’’
কিন্তু এত ফলনের কারণ কি?
জেলার কৃষি আধিকারিক বিকাশ বিশ্বাস জানান, এ বছরের আবহাওয়া সব্জি চাষের অনুকূল। সে কারণে প্রচুর সব্জি ফলেছে। এমনিতেই বন্যা বা অতিবৃষ্টির কারণে মাটি নরম থাকায় জমিতে ভাল ‘জো’ হয়েছে। তার উপরে বন্যার কারণে মাটিতে পলি পড়েছে। এ সবের পাশাপাশি এখন আকাশ পরিষ্কার। মেঘ নেই। কুয়াশাও নেই। তার উপর সামান্য ঠাণ্ডা ভাব আছে। এ সবই সব্জি চাষে উপযুক্ত পরিবেশ। আবার মেঘলা আবহাওয়ায় ‘জাব’ বা ‘শোষক’ প্রকার উৎপাত ফসল নষ্ট করে দেয়। এ বার
সেটাও হয়নি।
তবে ধান ছেড়ে বেশির ভাগ চাষি সব্জি চাষে মন দেওয়ায় বাজারে চাহিদার চেয়ে সব্জির জোগান বেশি। সেটাও সব্জির দাম পড়ে যাওয়ার একটা কারণ বলে মনে করেন সুনীলবাবু। তিনি জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে ধানের তেমন দাম না মেলায় বহু কৃষকই বোরো ধান চাষ না করে সব্জি চাষ করতে শুরু করেছেন। তাই চাহিদার থেকে জোগান বেশি হওয়ার দাম মিলছে না।’’
উৎসবের দিনগুলিতে সাধারণত মানুষ সব্জি কম খান। ফলে বাজারে চাহিদা কম থাকে। এখন বার উৎসবের মরশুম শেষ। তাই এ বার হয়তো বাঙালি সব্জি কেনায় মন দেবেন। তা হলে সব্জির দাম কিছুটা হলেও বাড়বে। সেই আশাতেই প্রহর গুনছেন চাষিরা।