যে রাস্তা দিয়ে বাস যায়, সেই রাস্তা দিয়েই চলে অটো, ম্যাজিক, লছিমন। যাত্রীরা কীসে উঠবেন? এক দিকে টানছেন ছোট গাড়ির চালকেরা। অন্য দিকে বাসের কন্ডাক্টর, খালাসি। দু’পক্ষের মধ্যে তাই লেগে রয়েছে নিত্য ঝঞ্ঝাট। যার জেরে বন্ধ থাকছে বাস। হয়রান হচ্ছেন যাত্রীরা।
জেলার প্রায় সমস্ত বাস রুটেই একই অবস্থা। তাই প্রায় সর্বত্রই দু’পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে গা-জোয়ারির নালিশ জানাতে ব্যস্ত। কিন্তু জেলা প্রশাসন এই দুই পক্ষের ঝামেলা নিরসনে তেমন তৎপর নয়। এমনটাই মত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। এই অবস্থায় ঘন ঘন বাস বন্ধ থাকাটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বাস মালিকদের একাংশ দাবি করছেন, জেলার ৫৯টা রুটেই প্রয়োজনের তুলনায় বাসের সংখ্যা বেশি। ফলে এমনিতেই যাত্রী সঙ্কটে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে বাস ব্যবসা। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো প্রায় সব রুটেই চলছে লছিমন, অটো, ম্যাজিকের মতো যাত্রীবাহী ছোট গাড়ি। বাস শ্রমিকদের অভিযোগ, জোর করে তাদের যাত্রী তুলে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই জুটছে গালাগাল ও মারধর।
আবার ম্যাজিক গাড়ির সংগঠন নদিয়া জেলা মিনি মোটর ইউনিয়নের সম্পাদক উৎপল মাইতির অভিযোগ, ‘‘বাস শ্রমিকরাই আমাদের মারধর করছেন।’’ নদিয়া জেলা বাস মালিক সমিতির পক্ষে অসীম দত্ত পাল্টা বলেন, ‘‘ছোট গাড়ির শ্রমিকরা জোর করে বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে মারধর করছে। তবুও আমরা বাস বন্ধকে সমর্থন করি না। কিন্তু শ্রমিকদের অনড় মনোভাবের কাছে অনেক সময় হার মানতে হয়।’’
এই পরিস্থিতিতেই মঙ্গলবার কৃষ্ণনগরের রবীন্দ্রভবনে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে ১০৬৩টি অটো ও ৬৫টি ম্যাজিক গাড়ি চালানোর অনুমতি দিল জেলার আঞ্চলিক পরিবহণ দফতর। সেই সঙ্গে বাস চালানোর অনুমতি মিলেছে সাকুল্যে ৮টি। ফলে জেলার পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেই মনে করছেন, এ বার সমস্যা আরও বাড়বে। নদিয়া জেলা নিত্য বাসযাত্রী সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত দে বলেন, ‘‘প্রশাসন কেন যে দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য কোনও পদক্ষেপ করে না, সেটাই বোঝা যায় না। এমনটা চলতে থাকলে আন্দোলনে নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।’’
জেলায় এই মুহূর্তে সিংহভাগ বাস শ্রমিকই তৃণমূল নিয়ন্ত্রিত শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি ছাতায় তলায়। সংগঠনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিঠু শেখ বলেন, ‘‘আমাদের কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনিতেই বাস লোকসানে চলছে। কর্মীরা বেতন পাচ্ছেন না। জেলা প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও কোন ফল হয়নি। শ্রমিকরা নিরুপায়।’’ সিটুর জেলা কমিটির সম্পাদক এমএস সাদিও আবার কার্যত ছোট গাড়ির ঢালাও অনুমোদনকেই সমস্যার মূল হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘‘কেউ কেউ বেআইনি ভাবে অটো-ম্যাজিক গাড়ির অনুমতি দিয়ে মুনাফা অর্জন করছেন। বাস শ্রমিকরা নানা ভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। গোটা পরিবহণ ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়েছে।’’ জেলা আঞ্চলিক পরিবহণ দফতরের বোর্ড-সদস্য গৌরীশঙ্কর দত্ত অবশ্য বলছেন, ‘‘বাস মালিক ও শ্রমিকদের ‘ব্লাকমেল’-কাছে আত্মসমর্পণ করার প্রশ্নই ওঠে না। তাই আমরা ছোট গাড়ির অনুমতি দিচ্ছি। যাঁদের কারণে মানুষের হয়রানি হবে, দল তাদের দায়িত্ব নেবে না।’’ কিন্তু এই দ্বন্দ্ব থামাতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করছে? অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ) শঙ্কর নস্করের আশ্বাস, ‘‘আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে কড়া কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’’
কিন্তু এমনই আশ্বাস বহু বার শুনেছেন নিত্যযাত্রীরা। সমস্যার পাকা সমাধান অধরাই থেকে যায়। তাঁদের বক্তব্য, অল্প দূরত্বে যেতে হলে ছোট গাড়িই ভাল। কিন্তু বেশি দূরে যেতে হলে বাস ছাড়া চলবে না। তা ছাড়া মহিলার, বৃদ্ধরা বাসই পছন্দ করেন। ছোট গাড়িতে শীতের বেলা যাতায়াত সমস্যার। কুয়াশায় রাস্তার দৃশ্যমানতা কমে যায়। গাড়ি জোরে যায়। যাত্রীও বেশি তোলা হয়। ফলে বিপদও বেশি। উল্টো দিকে, বাসে অনেক ক্ষেত্রে সময় লাগে বেশি। অনেক রুটেই বাস বিশেষ বিশেষ জায়গায় গিয়ে অনেকক্ষণ করে থেমে থাকে। তাই বাসের সময়সূচি নির্দিষ্ট করে দেওয়ারও দাবি তুলেছেন যাত্রীরা। সেই সঙ্গে তাঁরা দাবি তুলেছেন, রাস্তায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর।