খুদেদের সঙ্গে খুনসুটি বিরুর। থানারপাড়ায় দোগাছি গ্রামে কল্লোল প্রামাণিকের তোলা ছবি।
শীতকালে বিরুর লেপ চাই। গরমকালে পাখা। দুধ না হলে তার চলে না। বাইকে চড়তে তার ভাল লাগে। মোবাইলে গানও শোনা চাই। টিভির মেগা সিরিয়ালের কয়েকটি মুখ তার বেশ পরিচিত। পাড়ায় তার অনেক খুদে বন্ধু। বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলেও যায় সে। এমনই যার পছন্দের তালিকা সে কোনও মানুষ নয়। বিরু হল বছর দেড়েকের এক হনুমান।
পড়া না পারলে একঘর পড়ুয়ার সামনে মাস্টারমশাইয়ের মুখে গরু-গাধা-হনুমান শুনে কান লাল হয়নি এমন পড়ুয়া খুব কম আছে। দু’চার বেতের সঙ্গে মানুষ হয়েও ‘পবনপুত্র’-এর তকমা জুটেছে। তাই সত্যিই কোনও পবনপুত্রকে মানুষের মতো আচরণ দেখে অবাক থানারপাড়ার দোগাছির হালদারপাড়ার বাসিন্দারা।
কালবৈশাখীর ঝড়ে বটগাছের ডাল ভেঙে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল বিরুর মায়ের। রাস্তায় দিন দশেকের বিরুকে পড়ে থাকতে দেখে বাড়িতে তুলে এনেছিলেন পেশায় স্বর্ণশিল্পী অনুপ দাস। গায়ে তখন ঠিক মতো লোমও ওঠেনি। গরুর দুধ খাইয়ে বিরুকে বড় করেন অনুপবাবুর পরিবার। সেদিন থেকে বিরু দাস পরিবারের নতুন সদস্য।
অনুপবাবুর মা লক্ষ্মীদেবীর কথায়, ‘‘এখন বিরু মানুষের কথা বেশ বুঝতে পারে। পাড়ার খুদেরা তার বন্ধু।’’ সকাল-বিকেল খুদে বন্ধুদের সঙ্গে খেলে সে। তবে দুপুরে মিনিট দশেকের জন্য হলেও তার ঘুমানো চাই। সেটা বিছানায় হোক বা বসে। সন্ধ্যা হলে বিরু বাইরে বেরোয় না। তখন তার ঘুমের সময়। গরমে তার পাখা না হলে চলে না। শীতকালে চাই লেপ।
অনুপবাবু বলেন, “বিরুর গান শোনার খুব নেশা। মোবাইলে গান চালিয়ে দিলে সারাদিন শুনবে।’’ তবে স্বজাতীয় কাউকে দেখলে বা ডাক শুনলে ঘরের ভিতরে সেঁধিয়ে যায় বা বাড়ির কারও কোলে চেপে বসে। সিনেমা বা সিরিয়ালের ভক্ত বিরু। তবে ‘ডিসকভারি’ চ্যানেল চালালে দেখতে চায় না। কোনও পশুপাখির ছবি তার ভাল লাগে না।
দাস পরিবারের লোকেরা জানান, দুধ ও ফল খাওয়ানো হয় বিরুকে। তবে একটু ভাতও খায় সে। তবে তা বাড়ির কাউকে খাইয়ে দিতে হবে। কোনও দিন ওকে বকা দিলে মন খারাপ করে বসে থাকে। সারাদিন না খেয়ে কান্নাকাটি করে।
তবে বয়স যত বাড়ছে খুনসুটি করতে শিখেছে সে। অনুপবাবুর জ্যাঠা রবিবাবু বলেন, “ও নাতিদের সঙ্গে স্কুলে যায়। তবে বই, খাতা পেন্সিল নিয়ে পালিয়ে আসে। পাড়ার কোনও বাড়ি থেকে মোটরবাইকের চাবি নিয়ে পালিয়ে আসে।’’ তবে কোনও জিনিস হারায় না। সব কিছুই বাড়িতে নিয়ে আসে। তাঁরা জিনিস ফেরত দিয়ে আসেন। ওর পিছনে জিনিসের টানে কেউ ছুটছে দেখে মজা পায়। তবে এমন কাজে অনেকে রাগও করেন।
এ দিকে, এমন বন্ধুকে পেয়ে খুশি সবুজ, সুবীর, অঙ্কিতা বা দীপেরা। সকালে অঙ্গনওয়ারি স্কুল, দুপুরে বাড়িতে কিংবা বিকেলে বা ছুটির দিনে ওরা একসঙ্গে থাকে।
আধো গলায় অঙ্কিতারা বলে, ‘‘বিরু আমাদের খুব ভাল বন্ধু। আমাদের ছেড়ে আর কোথাও যায় না।’’ মানুষের কথা বুঝতে পারে কিনা কে জানে। এমন কথা শুনে অঙ্কিতাদের জাপটে ধরে বিরু।