এ এক আজব কাণ্ড!
ধুলিয়ানের কাঞ্চনতলা হাইস্কুলের সহিদুল ইসলাম অনূর্ধ্ব ১৯ বছর বিভাগে জেলা স্কুল স্পোর্টসে ডিসকাস ছুড়েছে ২৮ মিটার, শটপাট ১১.০৫ মিটার, জ্যাভেলিন ৪৩ মিটার। তিনটিতেই সেরা। রেকর্ড গড়েছে শটপাটে।
তবু রাজ্য স্কুল স্পোর্টসে যোগ দিতে পারল না সহিদুল। কেননা দু’মাস আগেই হয়ে গিয়েছে রাজ্য স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। রাজ্যস্তর থেকে ইতিমধ্যেই ৬৩ জন তিন দিনের জাতীয় স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যোগও দিয়ে ফেলেছে। কেরলে ২৯ জানুয়ারি থেকে তা হয়ে গিয়েছে।
এই ঘটনায় জেলার স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন জয়ী হাইস্কুলগুলির প্রধান শিক্ষকেরা। জেলার সফল ছাত্রছাত্রীদের প্রতি এই বঞ্চনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষা দফতরের কর্তারাও। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৮টি বিভাগে ৭২টি ইভেন্ট রয়েছে স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়। ব্লক, মহকুমা ও জেলা পর্যায়ের সফল প্রতিযোগীরা রাজ্যস্তরে যায়। রাজ্যের সফল প্রতিযোগীরা যায় জাতীয় প্রতিযোগিতায়। মুর্শিদাবাদের কপালে তা আর হল না।
কাঞ্চনতলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ফাইজুদ্দিন বিশ্বাসের আক্ষেপ, ‘‘সহিদুল জেলার পরে রাজ্য প্রতিযোগিতায় যাবে, এটাই জানতাম। কিন্তু এখন জানানো হয়েছে, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের রাজ্যস্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নভেম্বর মাসেই হয়ে গিয়েছে। ফলে, স্কুল ক্রীড়া ক্ষেত্রে এত ভাল ফল করেও রাজ্যস্তরে যোগ দিতে পারল না প্রত্যন্ত এলাকার গরিব ঘরের ওই ছাত্রটি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।’’
স্কুলস্তরে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়ে ‘ছেলেখেলা’ চলছে বলে অভিযোগ নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির জেলা সম্পাদক দুলাল দত্তের। তিনি বলেন, ‘‘স্কুল ক্রীড়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে একই নিয়ম। প্রাথমিকে চক্র, মহকুমা, জেলা ও সব শেষে সফল প্রতিযোগীরা যাবে রাজ্যে। হাই মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও মহকুমা, জেলা ও সফল প্রতিযোগীরা ২৮ থেকে ৩০ জানুয়ারি রাজ্যস্তরে যোগ দিয়েছে।’’ তাঁর আক্ষেপ, ‘‘বাম জমানাতেও হাইস্কুল স্তরে এটা হত। কিন্তু এখন নিয়মকানুনের বালাই নেই। তাই জেলার আগেই রাজ্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়ে যাচ্ছে। এতে জেলার স্কুলগুলিতে ক্রীড়ার পরিবেশ বলে আর কিছু থাকবে না।’’
পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক সমিতির জেলা সভাপতি মহফুজ আলম ডালিমের মতে, ‘‘দলতন্ত্রে নিয়ম-নীতির কোনও বালাই থাকে না। এই ক্ষেত্রেও স্বেচ্ছাচারী রাজ কায়েমের শিকার হয়েছে এই জেলার ছাত্রেরা। জেলার আগেই রাজ্য ক্রীড়া হয়ে যাওয়ার কথা বাম আমলেও শুনিনি।’’
জেলার সহকারী স্কুল পরিদর্শক পঙ্কজ পালও বলেন, ‘‘এই ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। রাজ্য থেকে মহকুমা কোনও সমন্বয় না থাকাতেই এই ঘটনা ঘটেছে। স্কুল ক্রীড়ার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, আমি বিষয়টি নিয়ে তাঁদের বলেছি। ধুলিয়ানের ছাত্রটি যে তিনটি ইভেন্টে প্রথম হয়েছে এবং রেকর্ড করেও রাজ্য ক্রীড়ায় যোগ দিতে না পারেনি, তার দায় কার?’’ তবে তাঁর আশ্বাস, পরে যাতে স্কুলপড়ুয়ারা এ জাতীয় ঘটনার শিকার না হয়, শিক্ষা দফতর তা দেখবে।
জেলা স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কার্যকরী সহ-সভাপতি তপন ত্রিপাঠী অবশ্য দাবি করেন, ‘‘রাজ্য স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নভেম্বরে হয়ে যাওয়ায় সমস্যা হয়েছে। তবে জেলায় এ বারে যারা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছে সাফল্য পেয়েছে তারা যাতে বঞ্চিত না হয়, তার জন্য তাদের নাম খাতায় লিখে রাখা হচ্ছে। ১০ মাস পরে, আগামী অক্টোবরে তাদের ডেকে পাঠানো হবে। তারা পরের রাজ্য স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে পারবে।’’
রাজ্যস্তর থেকে অবশ্য এমন কোনও আশ্বাস মেলেনি। দীর্ঘদিন জঙ্গিপুরে স্কুল ক্রীড়া কমিটির মহকুমা সম্পাদক ছিলেন ‘সাই’ প্রশিক্ষক সুবোধ দাস। জেলা স্কুল স্পোর্টসের কর্তাদের কথা শুনে হাসছেন তিনিও। সুবোধবাবু বলেন, ‘স্কুল ক্রীড়া হয় বয়সভিত্তিক। ১১ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত বিভাগ রয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে সফল প্রতিযোগীদের বয়স ও ক্লাস পেরিয়ে গেলে তারা নিজের ইভেন্টের প্রতিযোগিতায় কী ভাবে যোগ দেবে?’’
সুবোধবাবু জানান, রাজ্য থেকে জাতীয় স্তরে যেতে গেলে বয়সের শংসাপত্র পেশ করা বাধ্যতামূলক। সর্বক্ষেত্রে বার্ষিক জেলা স্পোর্টসের পরেই রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে স্পোর্টস হয়— এটাই নিয়ম। তিনি বলেন, ‘‘এ বছর জেলায় সফল প্রতিযোগী ১০ মাস পর যোগ দেবে পরের বছরের রাজ্য ক্রীড়ায়? এটা আমার স্পোর্টস শিক্ষকতার জীবনে কখনও দেখিনি।’’
রাজ্যের কর্তারা গোটা ঘটনার দায় চাপিয়েছেন জেলার কর্তাদের ঘাড়েই। তাঁদের দাবি, জেলাস্তর থেকে নিয়মিত কলকাতায় যোগাযোগ না রাখার ফলেই এই ফাঁক তৈরি হয়েছে। তার মাসুল দিতে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। তবে জেলার কর্তারা যদি দায়সারা ভাবে চলেও থাকেন, রাজ্যস্তর থেকে কেন তার দেখভাল করা হল না, তার সদুত্তর মেলেনি।
রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, ‘‘এ রকম কিছু আমার জানা নেই। এই ব্যাপারটা কারা দেখে, খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’’