জেলা সদর বহরমপুর থেকে লালগোলার দূরত্ব কম করে ৫০ কিলোমিটার। উল্টো দিকে কয়েক ধাপ দূরের কাঁটাতারের বেড়া টপকালে অথবা পদ্মানদীর জলসীমান্ত অতিক্রম করলেই বাংলাদেশের মাটিতে পড়বে পা। অনিবার্য ওই ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সীমান্ত শহর লালোগালার ললাট লিখনে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে হেরোইন পাচারের আন্তর্জাতিক ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’-এর তকমা। অস্বস্তিকর সেই তকমা ঝেড়ে ফেলতে গত বছর থেকে বইমেলাকেই হাতিয়ার করেছে দলমত নির্বিশেষ লালগোলার একদল যুবক। সোমবার তাঁদের উদ্যোগে এমএন অ্যাকাডেমি মাঠে শুরু হয়েছে ‘লালগোলা বইমেলা ও পুষ্প প্রদর্শনী’। মেলার উদ্বোধন করেন পুলিশসুপার সি সুধাকর। পাঁচ দিনের উৎসব চলবে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গির মিঞা জানান, হেরোইন ও সীমান্তের পাচার থেকে নয়া প্রজন্মের মুখ ঘোরাতে হলে প্রয়োজন সুস্থ সংস্কৃতির প্রসার ও প্রচার। ওই উদ্দেশ্যে ‘সঞ্জীবন’ নামের একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা লালগোলায় কয়েক বছর ধরে নিয়মিত ফুটবল টুর্নামেন্ট করছে। একই উদ্দেশে গত বার থেকে শুরু হয়েছে ‘লালগোলা বইমেলা ও পুষ্প প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠান। এ বার দ্বিতীয় বছর। প্রথম বছরের বইমেলা বিপুল সাড়া মেলায় উৎসাহী উদ্যোক্তারা দ্বিতীয় বছরে মেলার কলেবর বাড়িয়েছেন। গত বারের ৪ লক্ষ টাকা বাজেটের বইমেলায় স্টল ছিল ৪০টি। বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকার। এ বার সাড়ে ৪ লক্ষ টাকার বাজেটের মেলায় স্টল থাকছে ৪৫টি। কোনও স্টলের জন্যই ভাড়া লাগবে না। প্রবেশও অবাধ। উপরন্তু কলকাতার প্রকাশনা সংস্থার লোকজনদের লালগোলায় থাকা ও যাতায়াতের খরচ গত বারের মতো এ বারও বইমেলা কমিটিই বহন করবে।
কমিটির অন্যতম কর্তা অজয় ঘোষ বলেন, ‘‘বইমেলা প্রাঙ্গণে আবৃত্তি, বসেআঁকো, ক্যুইজ, ফটোগ্রাফি, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, নৃত্য ও সঙ্গীত-সহ নানা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিষয় ছাড়াও রয়েছে কবি সম্মেলন। মঞ্চস্থ হবে বহরমপুরের সপ্তর্ষি নাট্যসংস্থার নাটক ‘ডাইনি’, রঘুনাথঞ্জের নাট্যমবলাকার নাটক ‘বৃষ্টির জল’ ও বইমেলা কমিটির নিজস্ব নাটক ‘দর্পণ সাক্ষী’। লালবাগের নবাব পরিবারের মহিলারা পরিবেশন করবেন জারি ও সুফি গান।’’ থাকছে কোচবিহারের ভাওয়াইয়া, পুরুলিয়ার ঝুমুর, হৈমন্তী সরকার ও নয়ন সরকারের লোকগান, মনসুর ফকিরের বাউলগান ও দার্জিলিং-এর রাভা নৃত্য। দ্বিতীয় দিনে বইমেলা বিষয়ে আলোচনা করবেন সাহিত্যিক সৈয়দ হাসমত জালাল ও তৃতীয় দিনে ‘শিশুমন’ নিয়ে আলোচনা করবেন চিকিৎসক রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী।
‘আমরা ওরা’র অসুস্থ রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে মরুদ্যানের ভূমিকা নিয়েছে লালগোলা বইমেলা ও পুষ্প প্রদর্শনী। অন্যতম উদ্যোক্তা সাবিরুজ্জামান জানান, কংগ্রেসের দুই উপপ্রধান— যদুরাম ঘোষ ও অজয় ঘোষ, ব্লক তৃণমূলের দুই নেতা— জাহাঙ্গির মিঞা ও সারজেমান শেখ, সিপিএমের লোকাল কমিটির সম্পাদক কৃষ্ণা রায় চট্টোপাধ্যায় এবং বিজেপি-র ব্লক সভাপতি অমর দাস-সহ অনেকেই রাজনৈতিক ঝাণ্ডা সরিয়ে রেখে বইমেলা সফল করতে পরস্পরের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়েছেন।
কমিটির পক্ষে সারজেমান বলেন, ‘‘কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম, বিজেপি, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং এসডিপিআই-এর ব্লক সভাপতি ও সম্পাদকরা বইমেলার উদ্বোধনের আগে পায়ে পা মিলিয়ে পদযাত্রায় যোগ দেবেন। যোগীন্দ্রনারায়ণ রায় মঞ্চে তাঁরা পাশাপাশি বসে থাকবেন।’’ কমিটির যুগ্ম সম্পাদক পীতাম্বর সারেঙ্গি বলেন, ‘‘গত বারের মতো এ বারেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মেলাবে এই বইমেলায়।’