মেয়েকে মারতে মারতে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন মা। বছর সাতেকের মেয়েটির ঠাঁই হয়েছিল হোমে। শনিবার দুপুরে বহরমপুরের শিলায়ন হোমে গিয়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করে এলেন মা। বেঙ্গালুরু থেকে ফোন করলেন বাবাও। তবে জেলার শিশু সুরক্ষা আধিকারিকদের সামনে এ দিন অবশ্য কেউই ‘দুর্ঘটনা’ নিয়ে মুখ খোলেননি। ওই শিশুর মা এ দিন বলেন, ‘‘মেয়ের জেদের জন্যই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেটা নিয়ে আর কথা বলতে চাই না।’’
বাবা কলকাতায় বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। মা স্কুল শিক্ষিকা। তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের মামলা চলেছে। মেয়ে থাকে মায়ের কাছে। কথায় কথায় বায়না করে সে। কখনও মডেলদের মতো পোশাক পরতে চায়। কখনও বাড়ির খাবার ফেলে রেস্তোরাঁয় যেতে চায়। বাধা দিতে গেলে নাকি মাকেও মারধর করে। এমনই নানা অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি থেকে মেয়েকে বের করে দেন মা। পড়শি, পুলিশ হয়ে তার ঠাঁই হয় ওই হোমে। এ দিন অবশ্য সে তার মায়ের সঙ্গে কথা বললেও কোনও বায়না করেনি। তবে বাবার ফোন এলে সে শুধু ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য র্যাকেট আবদার করেছে। বাবাও তাকে কথা দিয়েছেন, বুধবার সেই র্যাকেট নিয়ে তিনি মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসবে।
এ দিন বেলা ১২ টা নাগাদ ওই হোমে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে যান শিশু সুরক্ষা দফতরের দুই আধিকারিক অর্জুন দত্ত ও উজ্জ্বল সাহা। মেয়েটি তখন স্নান ও খাওয়া সেরে সমবয়সী দু’জন বন্ধুর সঙ্গে বাগানে খেলছিল। শুক্রবার রাতে খাওয়া দাওয়া করলেও সে কারও সঙ্গে তেমন কথা বলেনি। তবে শনিবার সকালে ঘুম ভাঙতেই সমবয়সী দুই বন্ধু জুটে যায়। গোটা দিন আজ তাদের সঙ্গেই হেসে খেলে কাটিয়েছে সে। শনিবার দুপুরে ভাত, ডাল, আলুসিদ্ধ ও সোয়াবিনের তরকারি দিয়ে সে ভাত খেয়েছে। শিশু সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকেরাও তার সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা কাটিয়েছেন। তার মনখারাপ করছে কি না বারবার জানতে চান তারা। মেয়েটি জানায়, তার মনখারাপ করছে না। বড় বাগান, ফুল ও বন্ধুদের দেখে সে খুশি হয়েছে।
হোম কর্তৃপক্ষকে মেয়েটি জানিয়েছে, কলকাতার মামা ও ঠাকুমা তাকে খুব ভালবাসে। এ দিন অর্জুনবাবুর মোবাইলে ফোন আসে মেয়েটির বাবার। এখন তিনি অফিসের কাজে বেঙ্গালুরুতে আছেন। তিনি ফোনে মেয়ের সঙ্গে প্রায় দশ মিনিট কথা বলেন। তিনি জানান, জানান তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে সম্পর্কই থাক মেয়ের নিঃশর্ত দায়িত্ব নিতে চান তিনি। অর্জুনবাবু তাঁকে বুধবার শিলায়ন হোমে আসতে বলেছেন। মা ও মেয়ের সঙ্গেও কথা বলেন অর্জুনবাবু। মায়ের কথায়, ‘‘মেয়েকে এ ভাবে দেখব কখনও ভাবিনি। আসলে মেয়ে শুধু মাকে নয়, বাবাকেও কাছে চায়। মেয়ে চায় তার এক হাত ধরুক তার মা, অন্য হাত বাবা। শনিবার আমার স্বামীকে ফোন করেও মেয়ের ইচ্ছের কথা জানিয়েছি।’’
শিশু সুরক্ষা দফতরের জেলা আধিকারিক অর্জুন দত্ত বলেন, ‘‘শিশু কল্যাণ কমিটির বোর্ড বসবে বুধবার। সেখানে মেয়েটির মা, বাবা সকলকেই উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। শিশুটির ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য সে দিনই সিদ্ধান্ত নেবেন বোর্ডের কর্তারা। আপাতত ততদিন মেয়েটি হোমেই থাকবে। সে ভাল আছে। সুস্থ আছে। অনেক ভালবাসা ও ভাল লাগার কথার সঙ্গে সে মা, বাবার বিরুদ্ধে তার মান অভিমানের কথাও বলেছে।’’