হরিণ নেই, ‘ডিয়ার ফরেস্ট’ এখন দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল

এক সময় বনে হরিণ দেখতে হাজির হতেন প্রচুর মানুষ। প্রকৃতির কোলে হরিণ ছানাদের লুটোপুটি দেখে আনন্দ পেতেন ছেলে-বুড়ো সকলে। স্থানীয়দেরও কাছেপিঠে যাওয়ার জায়গা হিসেবে দ্রুত গড়ে উঠেছিল ফরাক্কায় ফিডার ক্যালেনের পাড়ে ১৫ হেক্টর জুড়ে গড়ে ওঠা ‘হরিণ বংশবিস্তার ও গবেষণা কেন্দ্র’।

Advertisement

বিমান হাজরা

শেষ আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০০:০০
Share:

বন্যপ্রাণী দূর। কোপ পড়েছে গাছেও। —নিজস্ব চিত্র।

এক সময় বনে হরিণ দেখতে হাজির হতেন প্রচুর মানুষ। প্রকৃতির কোলে হরিণ ছানাদের লুটোপুটি দেখে আনন্দ পেতেন ছেলে-বুড়ো সকলে। স্থানীয়দেরও কাছেপিঠে যাওয়ার জায়গা হিসেবে দ্রুত গড়ে উঠেছিল ফরাক্কায় ফিডার ক্যালেনের পাড়ে ১৫ হেক্টর জুড়ে গড়ে ওঠা ‘হরিণ বংশবিস্তার ও গবেষণা কেন্দ্র’।

Advertisement

কিন্তু রাজনীতি বড় বালাই। তার চেয়ে বড় আইনের প্যাচ। বন থেকে হারিয়ে গেল হরিণ। জঙ্গলের দখল নিল দুষ্কৃতীরা। দ্রুত কাটা পড়তে লাগল দামি দামি গাছ। শ্রী হারিয়ে বন এখন শ্মশান।

ষাটের দশকে ফরাক্কার ব্যারাজকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল নগরী। বাঁধ তৈরির পরেও ফরাক্কা শহরে ব্যারাজের অধিগৃহীত জমিতে গড়ে ওঠে ২১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বহু অফিস, কারখানা। এখনও বিপুল পরিমাণ ফাঁকা জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেখানেই ১৯৮২ সালে ফরাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ শহরের সৌন্দর্যায়ন বাড়াতে ফিডার ক্যানেলের পাড়ে ১৫ হেক্টর জমি জুড়ে গড়ে তোলে বনভূমি। লাগানো হয় মেহগনি, শাল, শিশু, সেগুন, ইউক্যালিক্টাস, আকাশমণি, অর্জুন-সহ হাজারো গাছের চারা। ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল ওই বনে
ডিয়ার পার্ক গড়ে তুলতে। কিন্তু অনুমতি মেলেনি।

Advertisement

বাম জমানায় ঠিক হয় ডিয়ার পার্ক নয়, ‘হরিণ বংশবিস্তার ও গবেষণা কেন্দ্র’ গড়ে তোলা হবে। মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন ফরাক্কার বাসিন্দা তৎকালীন সিপিএম সাংসদ আবুল হাসনাত খান। জেলা পরিষদ থেকে রাজ্য সরকার—সবই তখন বামেদের হাতে। স্বভাবতই দলীয় সাংসদের ওই উদ্যোগের আইনি দিকটা তলিয়ে দেখেননি কেউ। সাংসদের অনুরোধে মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ বনভূমিতে ওই কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব দিলে ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ তাতে না করেনি। ১৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১৫ হেক্টরের সেই বন ঘিরে দেওয়া হয় ইটের পাঁচিল ও কাঁটাতার দিয়ে। রঘুনাথগঞ্জ বন দফতর সেখানে বোর্ড ও গেট লাগিয়ে দেয়। নদিয়ার বেথুয়াডহরির বন থেকে আনা হয় ১২টি চিতল হরিণ। ২০০৩ সালে উদ্বোধন হয় ফরাক্কার ‘হরিণ বংশবিস্তার ও গবেষণা কেন্দ্র’-এর। ক্রমে ক্রমে লোকমুখে তাই পরিচিতি পায় ডিয়ার ফরেস্ট বা হরিণের বন হিসেবে।

বনের মধ্যে গড়ে তোলা হয় হরিণের বিচরণ ক্ষেত্র, খাবার জায়গা। দু’টো পুকুর খোঁড়া করা হয় হরিণদের জল খাওয়ার জন্য। নজরদারি ও দেখভালের জন্য তিন জন কর্মীকেও নিয়োগ করে জেলা বন দফতর। হরিণের খাবারের জন্য প্রতি বছর মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ ৪-৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে। বছর কয়েকের মধ্যেই হরিণের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে। সংখ্যা বাড়ায় কিছু হরিণ পাঠানো হয় মহানন্দার জাতীয় উদ্যানেও।

Advertisement

দুর্দিন শুরু হয় জেলা পরিষদে পালাবদল হতেই। জেলা পরিষদ থেকে হরিণের খাবারের বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হয়। খাবারে টান পড়ায় হরিণ মারা যেতে লাগল। তা নিয়ে হইচই শুরু হলে ‘সেন্ট্রাল জু অথরিটি’ ফরাক্কার ওই কেন্দ্র বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেয়। নির্দেশ মেনে গত বছর জানুয়ারিতেই সরিয়ে ফেলা হয় বাকি হরিণ। বনের দখল নেয় দুষ্কৃতীরা। তাদের দৌরাত্ম্যে কাটা পড়তে লাগল মেহগনি, শাল, শিশু, সেগুন, আকাশমণির মতো দামি গাছ। ভেঙে ফেলা হয় পাঁচিল। গেট এবং সাইন বোর্ড খুলে নিয়ে পালায় দুষ্কৃতীরা।

রঘুনাথগঞ্জের বন দফতরের রেঞ্জার বাবুরাম রবিদাস বলেন, ‘‘রাজ্য বন দফতরকে ওই বন হস্তান্তরিত করেনি ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ। আইনগত ভাবে তাই ওই বন আমাদের নয়।’’ তা হলে কেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন দফতরের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল। কেন বন পাহারায় কর্মী রাখা হয়েছিল। এখনও মোতায়েন রয়েছেন দুই বনকর্মী। উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘যে বন ও জমি আমাদের নয় সেখানে কারা, কেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন দফতরের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ছিল তা বলতে পারব না। তবে কর্মীদের আর ওখানে রাখা হবে না। কয়েক দিনের মধ্যেই বদলি করা হবে।’’

প্রাক্তন সাংসদ আবুল হাসনাত খানও মানছেন নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার কথা। তিনি বলেন, ‘‘চেষ্টা করেও ওই বনটি হস্তান্তর করা যায়নি। আমরা চেয়েছিলাম ওই বনকে ঘিরে ফরাক্কায় একটা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠুক। কিন্তু তা হয়নি।’’ এখন সব শেষ। হরিণ নেই। দিনের পর দিন দুষ্কৃতীরা বনের মধ্যে ঢুকে মেহগনি, সেগুন, শাল, শিশুর মতো মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে পালাচ্ছে। এমনকী, বন রক্ষীদের থাকার ঘরের দরজা, জানালাও খুলে নিয়ে পালিয়েছে দুষ্কৃতীরা। না ফরাক্কা ব্যারাজ, না রাজ্য বন দফতর কারও কোনও আগ্রহ নেই বনটিকে রক্ষা করার। বন এখন লুঠেরাদের কব্জায় বলে জানান তিনি।

বনের পাশেই থাকেন ৭২ বছরের প্রবীণ দ্বিজেন ঘোষ। তিনি জানান, চোখের সামনে গড়ে উঠতে দেখেছেন ফরাক্কা ব্যারাজকে। গাছ পাগল এক এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়রের সঙ্গে তাঁরাও গাছ লাগিয়েছেন ওই বনে। প্রতি সপ্তাহে কোথা থেকে নানা ধরনের গাছ আনতেন ওই ইঞ্জিনিয়র। সেই গাছ বড় হতে দেখলেন। দেখলেন তার নিধনও। তাই ধরা গলায় বলেন, ‘‘চোখের সামনে আমাদের সাধের বন শেষ হয়ে গেল।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement