গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পদ্মশিবিরে কমে যাচ্ছে দলবদলের দর। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলবদলুদের দর আক্ষরিক অর্থে ‘আকাশ ছুঁয়েছিল’। তৃণমূলের পাঁচ নেতাকে একসঙ্গে বিজেপিতে যোগদান করাতে কলকাতা থেকে দিল্লিতে উড়ে গিয়েছিল চার্টার্ড ফ্লাইট। কিন্তু সে ছিল কৈলাস বিজয়বর্গীয় জমানা। এখন চলছে সুনীল বনসল যুগ। অনেক ক্ষেত্রেই দরদস্তুরের অতীত হিসাব উল্টে দিচ্ছেন বর্তমান পর্যবেক্ষক। সে সবেরই অন্যতম উদাহরণ দলবদল নিয়ে রাজ্য বিজেপিকে বনসলের সাম্প্রতিক বার্তা।
সপ্তাহদুয়েক আগে দক্ষিণবঙ্গের একটি জেলায় একাধিক লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বকে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক বনসল। বৈঠকে ছিলেন রাজ্য বিজেপির সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, অগ্নিমিত্রা পালেরাও। বৈঠকে দলবদল সংক্রান্ত বিষয়ে বনসল তাঁর নীতি স্পষ্ট করে দেন। তিনি জানান, স্থানীয় স্তরে কেউ বিজেপিতে যোগদান করতে চাইলে তাঁকে দলে স্বাগত জানানোয় কোনও আপত্তি নেই। তবে সে সব যোগদান পর্ব মণ্ডল স্তরেই সেরে নিতে হবে। সকলকে রাজ্য দফতরে নিয়ে গিয়ে দলে স্বাগত জানানো হবে বা পাঁচ বছর আগের মতো সাড়ম্বরে ‘যোগদান মেলা’ আয়োজন করা হবে, এমন আশা যেন কেউ না করেন বলে বনসল বার্তা দেন।
বিজেপি সূত্রের খবর, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিট পাওয়ার শর্তসাপেক্ষে যাঁরা বিজেপিতে শামিল হতে চাইবেন, তাঁদের বিষয়ে আগ্রহ না দেখানোর বার্তাই দলকে দিয়েছেন বনসল। জেলা স্তরে নামী কোনও অ-বিজেপি নেতা যদি সংশ্লিষ্ট জেলার কোনও বিধানসভা আসনে প্রভাবশালীও হন, তা হলেও টিকিটের আশ্বাস দিয়ে তাঁকে দলে টানার প্রয়োজন নেই বলে বনসল জানিয়েছেন। তবে কেউ ‘নিঃশর্তে’ বিজেপিতে যোগ দিতে চাইলে তাঁর স্তর অনুযায়ী মণ্ডল বা জেলা নেতৃত্বই তাঁকে দলে স্বাগত জানাতে পারবেন।
ওই বৈঠকটি কয়েকটি লোকসভা কেন্দ্রের নেতাদের নিয়ে হয়েছে, তাই অনেকে মনে করছেন, বনসলের বার্তা সেখানে স্থানীয় স্তরের দলবদলের বিষয়েই সীমিত। কিন্তু বিজেপি সূত্রের বক্তব্য, রাজ্য স্তরের ক্ষেত্রেও তাঁর নীতি আলাদা কিছু নয়। বিধানসভা ভোটের আগে যাঁরা বিজেপিতে শামিল হতে চাইবেন, তাঁদের পরিচিতি বা প্রভাব যদি রাজ্য স্তরেরও হয়, তা হলেও ‘নিঃশর্ত যোগদান’ নীতির কোনও পরিবর্তন হবে না। তেমন হলে শুধু ওই স্তরের নেতাদের ক্ষেত্রে যোগদান করানো বা না করানোর সিদ্ধান্ত বিজেপির রাজ্য বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেবেন। কিন্তু টিকিটের আশ্বাস কাউকেই দেওয়া হবে না।
কৈলাস-যুগে কিন্তু বিজেপির নীতি অন্য রকম ছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলের মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক-সহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকে বিজেপিতে যোগদান করানো শুরু হয়েছিল। ২০২০ সালের শেষে এবং ২০২১ সালের শুরুতে সে পর্ব তুঙ্গে পৌঁছোয়। ২০২১ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৎকালীন মন্ত্রিসভা এবং ডোমজুড়ের বিধায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিতে শামিল হন। হাওড়ার ডুমুরজলা স্টেডিয়ামে অমিত শাহের জনসভায় রাজীব-সহ আরও কয়েক জন তৃণমূলত্যাগী বিধায়ক-নেতা বিজেপির পতাকা নেবেন বলে স্থির হয়েছিল। কিন্তু দিল্লিতে ইজ়রায়েলি দূতাবাসের সামনে বিস্ফোরণের জেরে শাহের বঙ্গসফর অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে বিশেষ বিমান ভাড়া করে পাঁচ জনকে দিল্লি উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সে তালিকায় রাজীব ছাড়াও ছিলেন রানাঘাটের পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়, হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র রথীন চক্রবর্তী, বালির তৎকালীন বিধায়ক বৈশালী ডালমিয়া, উত্তরপাড়ার তৎকালীন বিধায়ক প্রবীর ঘোষাল। শাহের বাসভবনে তাঁদের বিজেপি-ভুক্তি সম্পন্ন হয়। বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচ জনই বিজেপির টিকিট পান। জেতেন শুধু পার্থসারথি। হারের পর রাজীব এবং প্রবীর পুরনো দলে ফিরে যান।
বনসলের দলবদল-নীতির কারণ বোঝা শক্ত নয়। ভারিক্কি নেতাদের দলে টানলেই যে তাঁদের আসনে ভোটের ফল বদলে যায় না, সে শিক্ষা বিজেপি ২০২১ সালেই পেয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় যাঁরা তৃণমূলের প্রথম সারির মুখ, তাঁদের ভোটের আগে দলে টেনে বিজেপি নিজেদের ভাবমূর্তিতেই ধাক্কা দিয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। বনসলের বার্তা প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য না করলেও রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক অগ্নিমিত্রা বলছেন, ‘‘দলে যে কেউ আসতে পারেন। কিন্তু কিছু পাওয়ার আশায় এলে চলবে না।’’ তাঁর কথায়, ‘‘কোনও অরাজনৈতিক ব্যক্তি কাল বিজেপিতে এলে তিনি যতটা নতুন হিসাবে বিবেচিত হবেন, অন্য কোনও দল থেকে এলেও ততটাই নতুন হিসাবে বিবেচিত হবেন। কোনও ফারাক করা হবে না।’’