হাতির সঙ্গে সংঘাত ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ রেল এবং বন দফতরের। —নিজস্ব ছবি।
জঙ্গলে ঘেরা রেলপথে বন্যপ্রাণী এবং মানুষের সংঘাত নতুন নয়। তার মধ্যে জলদাপাড়া, বক্সার জঙ্গল দিয়ে আবার ট্রেন চলবে৷ বনাঞ্চলের ট্রেন চালানোর সময় হাতি-সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সংঘাত ঠেকাতে প্রযুক্তির সাহায্য নিল রেল এবং বন দফতর৷ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যখন গতি কমিয়েও মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতেই (এআই) ভরসা রাখছে তারা।
২০২২ সালের ডিসেম্বর নাগাদ হাতির মৃত্যু আটকাতে ‘এআই অ্যালিসেন্স’ বলে একটি প্রকল্প তুলে ধরেছিল রেল এবং বন বিভাগ। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংস্থা ‘সলিটারি ন্যাচার অ্যান্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশন ফাউন্ডেশন’-এর এই প্রজেক্টে অত্যাধুনিক ক্যামেরার সঙ্গে অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির আরও বেশ কিছু সরঞ্জাম রয়েছে৷ নাইট ভিশন ক্যামেরা এবং সেন্সারের সাহায্যে কোনও বন্যপ্রাণীকে চিহ্নিত করে রেল এবং বন বিভাগের কন্ট্রোল রুম পর্যন্ত ভিডিয়ো এবং ছবি পাঠানো হয়। ২০২২ সাল থেকে কাজ শুরু হয়েছিল। ইতিমধ্যে গরুমারা বনাঞ্চলের চাপড়ামারি এবং জলপাইগুড়ি ডিভিশনের ধরণীপুর, রেড ব্যাঙ্ক, দেব পাড়া, ডায়না এবং মোরাঘাট পর্যন্ত এই প্রযুক্তি কাজ করছে৷ তাতে সাফল্যও এসেছে৷ প্রায় ৩০০ হাতির মৃত্যু ঠেকানো গিয়েছে বলে দাবি।
রেললাইন থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরত্বে ক্যামেরা এবং সেন্সর ‘ইনস্টল’ করা হয়েছে। তাই হাতির গতিবিধি কন্ট্রোল রুম থেকে ট্রেনচালক পর্যন্ত সময়মতো পৌঁছে যায়। বিপদ বুঝলে ট্রেন থামানোর সময় পান চালক।
এ ছাড়়াও রেল থেকে আইডিএস সিস্টেম বা ‘ইনট্রুশন ডিটেকেশন সিস্টেম’ বসানো হয়েছে। এখন নাগরাকাটা থেকে মাদারিহাট পর্যন্ত এই নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যবস্থা উপলব্ধ। কোনও বন্যপ্রাণীর শব্দ অপটিক ফাইবারের মাধ্যমে কন্ট্রোল রুমে চলে যায়। স্বয়ংক্রিয় এই পদ্ধতিতে চালক ওই তথ্য পেয়ে ট্রেন থামিয়ে দেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যা হল রেললাইন থেকে সেন্সরের দূরত্ব মেরেকেটে ১০ মিটার। তাই তথ্য পাঠাতে পাঠাতেই হাতি অনেক সময়ই রেললাইনে উঠে পড়ে। সে দিক খতিয়ে দেখে আরও কিছু ভাবনাচিন্তা করেছে রেল। পরিবেশবিদ অনিমেষ বসুর কথায়, ‘‘হাতি আটকাতে অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে৷ আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য মৃত্যু আটকানো। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রেনে গতি কমিয়ে নিয়ে এসে মৃত্যু অনেকটাও কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে৷ কিন্তু রেললাইন থেকে যে সেন্সরের দুরত্ব যত বেশি থাকবে বন্যপ্রাণীর মৃত্যু আটকানো ততটাই সহজ হবে।’’
‘সলিটারি ন্যাচার অ্যান্ড অ্যানিম্যাল প্রোটেকশন ফাউন্ডেশন’-এর ডিরেক্টর কৌস্তভ চৌধুরী বলেন, ‘‘২০২২ সালে আমাদের প্রকল্প শুরু হয়েছে। বন বিভাগ এবং রেলের সঙ্গে মিলে এই কাজ করছি। তাতে প্রায় ৩০০-র বেশি হাতি বাঁচাতে পেরেছি আমরা।’’ কৌস্তভ জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকল্প নেই।
প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করেই যখন বন্যপ্রাণ রক্ষার সিদ্ধান্ত, সে ক্ষেত্রে এআই ক্যামেরার উপর আরও জোর দিতে চাইছে রেল। সূত্রের খবর, কর্নাটকে এআই ক্যামেরা লাগিয়ে পাইলট প্রজেক্ট শুরু হয়েছে। সেখানে সুফল মিলেছে। তাই এ বার উত্তর-পূর্ব ভারত সীমান্তে এআই ক্যামেরা ব্যাবহার করতে চাইছে রেল। প্রায় ১১,৪৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে এ জন্য। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জলকিশোর শর্মা বলেন, ‘‘আইডিএস সিস্টেম তো রয়েইছে। পাশাপাশি, এ বার এআই ক্যামেরা যুক্ত করা হবে হাতির করিডরগুলিতে। নাগরাকাটা থেকে আলিপুরদুয়ার পর্যন্ত আইডিএস সিস্টেমের কাজ শেষ হবে আগামী এপ্রিলে। তার পর এআই ক্যামেরা দিয়েও চিহ্নিত করা যাবে হাতি।’’