পর্যটন হয়নি, শিলিগুড়ির নদীবাঁধ অপরাধের আস্তানা

শহরের যে নদী বাঁধগুলিকে ধিরে পর্যটনের সম্ভাবনা ছিল, সন্ধ্যার পরে সেই বাঁধ জুড়ে শুরু হয় অবাধ নেশার আসর এবং অসামাজিক কাজকর্ম। বছর দুয়েক আগে জলপাইগুড়ি জেলাশাসকের অফিস লাগোয়া বাঁধের থেকে এক কিশোরীর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০১৫ ০২:২৭
Share:

শহরের যে নদী বাঁধগুলিকে ধিরে পর্যটনের সম্ভাবনা ছিল, সন্ধ্যার পরে সেই বাঁধ জুড়ে শুরু হয় অবাধ নেশার আসর এবং অসামাজিক কাজকর্ম। বছর দুয়েক আগে জলপাইগুড়ি জেলাশাসকের অফিস লাগোয়া বাঁধের থেকে এক কিশোরীর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। শহরের করলা এবং তিস্তা নদীর তিনটি বাঁধ জুড়ে সন্ধ্যের পর থেকে নিয়মিত নজরদারির সিদ্ধান্ত হয়। গত সোমবার রাতে বাঁধ লাগোয়া পার্কে এক নাবালিকাকে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পর দিন সকালে পাশের আরেকটি বাঁধ থেকে কিশোরীকে পরিবারের সদস্যরা খুঁজে পান বলে অভিযোগ। শহরের বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, এই ঘটনা দেখিয়ে দিল দিনের আলো নেভার পর বাঁধের আসল চেহারা। যা গত দু’বছরেও বিন্দুমাত্র বদলায়নি।

Advertisement

নাবালিকাকে গণধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরে, গত বুধবার থেকে জলপাইগুড়ি শহরের তিস্তা এবং করলা নদীর বাঁধগুলিতে পুলিশি টহল শুরু হয়েছে। গাড়ি ছাড়া বাইকে চেপেও পুলিশ কর্মীদের টহলদারি দিতে দেখা গিয়েছে। তাতে অবশ্য পরিস্থিতি বদলানোর খুব একটা আশা করছেন না বাসিন্দাদের অনেকেই। তাঁদের আশঙ্কা, ঘটনাটি থিতিয়ে গেলে, তৎপরতা কমে যাবে। কারণ বছর দুয়েক আগেও এমনই ঘটনার অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি জেলাশাসক-বিভাগীয় কমিশনারের অফিস ঘেঁষে থাকা করলা বাঁধের থেকে এক কিশোরীর দেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। নদীর কাদায় গুঁজে দেওয়া হয়েছিল কিশোরীর মুখ। দেহের পাশ থেকে উদ্ধার হয়েছিল বিয়ারের বোতলও। তদন্তে পুলিশ জেনেছিল, খুন করে কিশোরীর মুখ পাঁকে গুঁজে দেওয়া হয়েছিল।

ওই ঘটনার পরে তৎকালীন জেলাশাসক-পুলিশ সুপার এবং পুরসভার চেয়ারম্যান বৈঠকে বসেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সন্ধ্যের পর থেকে রাত পর্যন্ত তিনটি বাঁধে নজরদারি চলবে। সন্ধ্যের পরে বাঁধের দু’দিকের মুখে সাদা পোশাকে পুলিশ বাহিনী রাখার সিদ্ধান্তও হয়। নজরদারিতে সুবিধের জন্য বাঁধের কয়েকটি এলাকায় স্থায়ী পুলিশ পিকেট এবং আলো বসানোর প্রস্তাব ছিল। সে সব সিদ্ধান্তের বেশির ভাগটাই যে কাগজে কলমে রয়ে গিয়েছে তা প্রতিদিন সন্ধ্যের পরে বাঁধে এলেই টের পাওয়া যায় বলে ভুক্তোভোগীদের অভিযোগ। তিনটি বাঁধেরই বিভিন্ন এলাকায় গোল হয়ে বসে অথবা বাইক দাঁড় করিয়ে রেখে চলতে থাকে মদের আসর। আঠার নেশা থেকে মোম জ্বালিয়ে জুয়ার ঠেক, সবই অবাধে চলে বলে বাঁধ দিয়ে যাতায়াতকারীদের অভিযোগ। মাঝে মাঝে পুলিশি অভিযানে আসর ভেঙে গেলেও, এক দিন বা দু’দিন পরেই ফের শুরু হয়ে যায় বলে অভিযোগ। শুধু আসর নয়, চড়া দামে সব রকমের মদই বাঁধের কয়েকটি এলাকাতে বিক্রি হয় বলেও দাবি।

Advertisement

বাঁধ নিয়ে নানা অভিযোগ শুনেছেন বর্তমান জেলাশাসক পৃথা সরকারও। তিনি বলেন, ‘‘বাঁধে অসামাজিক কাজকর্ম হয় বলে রিপোর্ট পেয়েছি। নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’’

২০১৩ সালের ঘটনার পরে বাঁধের কয়েকটি জায়গায় আলোও বসিয়েছিল পুরসভা। দুষ্কৃতীরা সে আলো ভেঙে দিয়েছে বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। পুরসভার বিদায়ী চেয়ারম্যান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘নিয়মিত নজরদারি যে হচ্ছে না তা নিয়ে প্রশাসনকে একাধিক বার লিখিত এবং মৌখিক ভাবে জানিয়েছি। তাও কোনও ফল হয়নি। নজরদারির অভাবেই বছর দুয়েক আগে এক কিশোরীকে খুন হতে হয়েছিল, এবার গণধর্ষণের ঘটনাও ঘটল।’’

বাঁধে যাওয়া বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শহরের পরিবেশপ্রেমী সংগঠনের সদস্য রাজা রাউত অভিযোগ করে বলেন, ‘‘তিস্তা এবং করলা বাঁধ ঘিরে প্রশাসনের পর্যটনের প্রস্তাব ছিল। সে সব কবেই জলে ভেসে গিয়েছে। এখন রাত হলেই নেশার আসর বসে। রাতের বেলায় বাঁধে হাঁটতে গিয়ে ছিনতাইয়ের মুখেও পড়তে হয়েছে কয়েক জনকে।’’ সমাজকর্মী সুব্রত সরকারের অভিযোগ, ‘‘নদীর ঠান্ডা হাওয়া এবং মনোরম পরিবেশের জন্য অনেকেই বাঁধে হাঁটতে চান। কিন্তু যে পরিস্থিতি হয়ে থাকে, তাতে মহিলারা তো বটেই পুরুষরাও বাঁধে যেতে চান না।’’

পুলিশের তরফে অবশ্য বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জেমস কুজুর বলেন, ‘‘বাঁধে নিয়মিত নজরদারি এবং পুলিশি অভিযান চলে। তবে বর্তমানে কী ধরণের ব্যবস্থা রয়েছে তা ফের যাচাই করে দেখা হবে। বাসিন্দাদের আতঙ্কের কোনও কারণ নেই।’’

দু’বছর আগের ঘটনার পরেও বাঁধ একই আশ্বাস পেয়েছিল শহরবাসী। তার কতটা রূপায়িত হয়, সেটাই দেখার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement