প্রশান্ত নন্দীর প্রশান্ত নন্দীর অন্তিম যাত্রায় শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন শিলিগুড়ি শহরের ডানপন্থী মানুষেরা।
উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রশান্ত নন্দীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসার জন্য দিল্লি গিয়ে ফেরার পথে বুধবার গোরখপুরের কাছে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল (৭২)। রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্বে অবশ্য তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন প্রশান্তবাবু। কিন্তু, সব দলের লোকজনের সঙ্গে আমৃত্যু সখ্য ছিল তাঁর।
সম্প্রতি অসুস্থতা বাড়লে লক্ষ্মীপুজোর পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য দিল্লির এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের পক্ষ থেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পথে ভেন্টিলেশনে রেখেও বাঁচানো যায়নি তাঁকে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর দেহ শিলিগুড়ির ডাবগ্রামের বাড়িতে আনা হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের দফতর থেকে ফোন করা হয়েছে বলে বাড়ির লোকজন জানিয়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোক বার্তা পাঠিয়েছেন রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেবের মাধ্যমে। প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী। দার্জিলিং জেলা কংগ্রেস সভাপতি শঙ্কর মালাকার বলেন, ‘‘অধীরবাবুর শোকবার্তা আমি পৌঁছে দিয়েছি। ওঁর মৃত্যুতে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে যে শূন্যস্থান হল তা পূরণ হওয়ার নয়।’’
কংগ্রেস ও তৃণমূলের নেতারা জানান, প্রশান্তবাবু বরাবর প্রণববাবুর স্নেহধন্য ছিলেন। গত ১১ বছর ধরে দিল্লিতে তাঁর চিকিৎসার নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া ছাড়াও নানা সহায়তা করতেন প্রণববাবু। উত্তরবঙ্গে এলে অবশ্যই দেখা করতেন। এদিন গোটা শোকযাত্রায় শহরের কংগ্রেস, তৃণমূলের বহু নেতা-কর্মীরা। ছিলেন একাধিক কাউন্সিলর। ৭০ দশকে প্রশান্তবাবু ডাবগ্রাম এলাকার পুর কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর দেহ বাড়ি, স্থানীয় কয়েকটি ক্লাব হয়ে পুরসভায় নেওয়া হয়। শেষ শ্রদ্ধা জানান সিপিএমের নুরুল ইসলাম, মুকুল সেনগুপ্ত, শরদিন্দু চক্রবর্তী, শঙ্কর ঘোষ সহ পুর আধিকারিকেরা।
অন্তিম যাত্রায় গৌতম দেব।
প্রবীণ নেতার শেষযাত্রায় আগাগোড়া পা মেলেন মন্ত্রী তথা তৃণমূল জেলা সভাপতি গৌতম দেব। গৌতমবাবু বলেন, ‘‘প্রশান্তদা রাজনীতিতে বরাবর আমাদের অভিভাবকের মত ছিলেন। শেষদিকে শরীর ঠিক না থাকায় সব জায়গায় যেতে পারতেন না। তবে বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হল।’’
শহরের ডানপন্থী রাজনীতিতে প্রশান্তবাবু নিজের মতো করেই চলতেন। হিলকার্ট রোডের জগদীশ ভবনে তিনি দফতর তৈরি করে বসতেন। তাঁর হাত ধরেই জগদীশ ভবন থেকেই শহরের বর্তমানের বহু নেতা তৈরি হয়েছে। সেখানেও এ দিন মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। ছিলেন সুবীন ভৌমিক, কুন্তল গোস্বামীরা। রাজনীতির জীবনে বাম আমলে দুই দফায় মেয়র তথা শিলিগুড়ির বিধায়ক অশোক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থীও হয়েছেন প্রশান্তবাবু। এক দফায় হাড্ডাহাড্ডির মুখেও পড়তে হয়েছিল অশোকবাবুকে। তার পরেও অশোকবাবু, সিপিএমের জেলা সম্পাদক জীবেশ সরকারের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে সম্পর্ক ছিল প্রশান্তবাবু।
মেয়র অশোকবাবু বর্তমান দিল্লিতে আছেন। তিনি বলেন, ‘‘অত্যন্ত সজ্জন নেতা ছিলেন। প্রচুর পড়াশুনো করতেন। নানা পরামর্শও নিতাম। উন্নয়নের কাজে সাহায্য করতেন। অসুস্থ হওয়ার পরেই বাড়িতে যেতাম। নানান কথা হত।’’ জীবেশবাবুও কলকাতায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘রাজনীতি আলাদা করলেও ওঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্যতা ছিল। উনি বিরাট মনের মানুষ ছিলেন।’’
পুরসভা থেকে কলেজপাড়া হয়ে দেহটি নিয়ে শোকযাত্রা পৌঁছায় শিলিগুড়ি মহকুমা ক্রীড়া পরিষদে। আগাগোড়া ছিলেন, কংগ্রেস নেতা সুজয় ঘটক, তৃণমূলের কৃষ্ণ পাল, নান্টু পাল, বিকাশ সরকার, মদন ভট্টাচার্য, বিকাশ সরকার-সহ বহু নেতা। পরে হিলকার্ট রোড থেকে তাতে যোগ দেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি তথা বিধায়ক শঙ্কর মালাকারও-একাধিক কংগ্রেস নেতারা। শঙ্করবাবু বলেন, ‘‘ডানপন্থী রাজনীতিতে প্রশান্তদা সব কিছুর ঊর্ধ্বে ছিলেন। আমাদের সবার দাদা ছিলেন। অপূরণীয় ক্ষতি হল।’’
বর্তমান রাজনীতিতে দূরত্বে থাকলেও এ দিন কংগ্রেস-তৃণমূল নেতানেত্রীরা এক সঙ্গেই শেষযাত্রায় পা মেলান। এক সময় হিলকার্টরোডের ট্রাফিক এক দিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শ্মশানে সবাই এক সঙ্গে শেষকৃত্য অবধি ছিলেন। হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের (ন্যাফ) তরফে অনিমেষ বসু সহ অনেকেই শেষকৃত্যে যোগ দেন। অনিমেষবাবু বলেন, ‘‘রাজনীতির দুনিয়ার এমন বড় হৃদয়ের মানুষ ক্রমশ বিরল হয়ে পড়ছে। প্রশান্তদার অভাব কোনদিন পূরণ হবে বলে মনে হয় না।’’ বিধান মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি সহ নানা সংগঠনের কর্তারা শ্মশানেও যান।
ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।