মৃত ছাত্রীর শোকার্ত পরিজনেরা। নিজস্ব চিত্র।
অভাবী পরিবারের এক মেধাবী ছাত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদের আরাজি কাশিমপুর এলাকার এই ছাত্রী সাবিনা ইয়াসমিন (২১) কালিয়াগঞ্জ কলেজের অঙ্কের ছাত্রী ছিলেন। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় তাঁর আসন পড়েছিল ইটাহার কলেজে। বুধবার পরীক্ষার পরে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। তাঁর বাবা ইশাহাক মহম্মদ পেশায় দিনমজুর।
বৃহস্পতিবার সকালে ইটাহার কলেজের শৌচাগারের দরজার উপর থেকে গলায় ওড়নার ফাঁস লাগানো অবস্থায় সাবিনার দেহ মেলে। তাঁর পায়ের পাশে টুকলির বেশ কিছু কাগজও উদ্ধার করেছে পুলিশ। শৌচাগারের দরজাটি খোলা ছিল। ওই ছাত্রীর দু’টি পা ঠেকে ছিল মাটিতে। তাই এটি আত্মহত্যা না খুন, সেই বিষয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে। তা ছাড়া কী ভাবে সাবিনা প্রায় সাড়ে সাত ফুট উঁচুতে থাকা দরজার উপরে উঠে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়লেন, তা নিয়েও ধন্দে পড়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, সাবিনার পোশাকের ভিতর থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, গত বুধবার পরীক্ষা দেওয়ার সময়ে নকল করার অপরাধে শিক্ষকেরা তাঁর টুকলি ও খাতা কেড়ে নেন। তিনি বারবার খাতা ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেও তাঁরা খাতা ফেরত দেননি। শিক্ষকেরা ক্ষমা না করায় তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন। যদিও সাবিনার মা কোহিনুর খাতুনের দাবি, তাঁর মেয়ে বরাবরই পড়াশোনায় ভাল। পরীক্ষায় তিনি টুকলি করবেন সেটা অবিশ্বাস্য।
কলেজের প্রশাসক তথা রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অশোক দাসের দাবি, পরীক্ষার্থী অসৎ উপায় নিলে তা আটকানোই শিক্ষকদের কর্তব্য। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাসমূহের নিয়ামক সনাতন দাস বলেন, ‘‘আগে কাউকে টুকলি করার সময় ধরে ফেললে পরীক্ষা থেকে তাঁকে বিতাড়িত করে দেওয়া হত। এখন তা হয় না। আরএ করা হয়। ওই ঘরের নজরদারির দায়িত্বে থাকেন যে শিক্ষক, তিনি একটি রিপোর্ট দেন বিশ্ববিদ্যালয়কে। সেই রিপোর্ট মতোই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওই পরীক্ষার্থী সেই দিন আর পরীক্ষা দিতেও পারবেন না।’’
কলেজ সূত্রের খবর, ওই দিন কলেজের ৯ নম্বর ঘরে স্নাতক বিষয়ের অঙ্কের পঞ্চম পত্রের পরীক্ষা ছিল। প্রায় আড়াই ঘন্টা পরীক্ষা দেওয়ার পর এক শিক্ষক সাবিনাকে টুকলি করতে দেখেন। তিনি আরও দুই শিক্ষককে জানান। এরপরেই ওই তিন শিক্ষক সাবিনার টুকলি ও খাতা কেড়ে নেন বলে কলেজ ও ছাত্রছাত্রীদের সূত্রে জানা গিয়েছে। খাতা কেড়ে নেওয়ার পর সাবিনা একাধিকবার ওই শিক্ষকদের খাতা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন। খাতা ফেরত পেরে পারেন, এই আশায় তিনি প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি পরীক্ষাকেন্দ্রে নিজের আসনে বসে অপেক্ষাও করেন। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকেরা খাতা ফেরত না দেওয়ায় তিনি পরীক্ষাকেন্দ্র ছেড়ে চলে যান।
ওই দিন রাতে ইশাহাকবাবু হেমতাবাদ থানায় গিয়ে মৌখিক ভাবে অভিযোগ জানান। রাতেই হেমতাবাদ থানার ওসি মনোজিৎ দত্ত ইটাহার থানার ওসি নিমশেরিং ভুটিয়াকেও বিষয়টি জানান। নিমশেরিংবাবুর দাবি, রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীকে ফোন করে ওই ছাত্রীর খোঁজ খবর করেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমরা ভিতরে গিয়ে তল্লাশি চালাতে পারি না।’’ কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ রাতে কেন কোনও ঘরে কেউ রয়ে গিয়েছেন কি না না দেখেই কলেজ বন্ধ করে দিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাবিনার পরিজনেরা জানিয়েছেন, তাঁরা কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করবেন না। পুলিশের উপরে তাঁদের আস্থা রয়েছে। পুলিশই তদন্ত করে দেখুক, কী ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে। তারপরেই জানা যাবে ওই ছাত্রীর মৃত্যুর কারণ কী।