প্রদীপ বর্ধনের দেহ নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।
নতুন ঘরদোর রং করানো প্রায় শেষের পথে। তাই সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে মাংস ও ভাতের আয়োজন করেছিলেন গৃহকর্তা। তখনই প্রদীপ বর্ধন (৬২), তাঁর স্ত্রী দীপ্তি বর্ধন (৫০) এবং ছেলে প্রসেনজিৎকে (২৬) খুন করে বাড়ির সর্বস্ব লুঠপাট করে পালায় একদল দুষ্কৃতী। শিলিগুড়ি লাগোয়া মাটিগাড়ার লেনিনপুরে এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের পরে পুলিশের এমনই ধারণা।
সারা রাত অবশ্য সে কথা জানা যায়নি। মঙ্গলবার সকালে প্রদীপবাবুর বাড়ি থেকে তাঁদের দেহ উদ্ধার হয়। ওই বাড়িতে তাঁরা তিন জনেই থাকতেন। পুলিশের চিকিৎসক জানিয়েছেন, সোমবার রাত ৮টা নাগাদ তাঁদের মাথায় বাড়ি মেরে ও গলায় ফাঁস দিয়ে খুন করা হয়েছে। খুনের মামলা রুজু করেই তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী প্রদীপবাবু বছর দু’য়েক হল এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর ছেলে প্রসেনজিৎ পূর্ত দফতরের কম্পিউটার বিভাগের চুক্তি ভিত্তিক কর্মী ছিলেন। মেয়ে রেশমিদেবীর বছর সাতেক আগে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এ দিন খবর পেয়ে এসে বাবা-মা-ভাইয়ের দেহ দেখে তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন।
নতুন বাড়িতে রং করানোর জন্য তিন রং মিস্ত্রিকে নিজের বাড়িতেই থাকতে দিয়েছিলেন প্রদীপবাবু। ঘটনার রাত থেকে সেই তিন জনই নিখোঁজ। তবে ওই রং মিস্ত্রিদের এক সহযোগীকে পুলিশ আটক করেছে। নিহতদের মোবাইলগুলি নিখোঁজ। ওই নম্বরগুলির কল-রেকর্ড পুলিশ খতিয়ে দেখছে। শিলিগুড়ির সিপি মনোজ বর্মা বলেন, ‘‘তদন্ত চলছে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না।’’
পুলিশ জানায়, প্রদীপবাবুর গলায় নারকেলের দড়ি দিয়ে ফাঁস লাগানো ছিল। তাঁর মাথায় রং ভর্তি বালতি উপুড় করে দিয়েছিল দুষ্কৃতীরা। দেহ উদ্ধারের সময় মাথা থেকে বুক পর্যন্ত সেই রঙের প্রলেপ ছিল। দোতলার বাথরুমে পাওয়া যায় প্রদীপবাবুর দেহ। এক তলার বসার ঘরে পাওয়া যায় দীপ্তিদেবী ও প্রসেনজিতের দেহ। প্রসেনজিতের গলায় চাদরের ফাঁস লাগানো ছিল। দীপ্তিদেবীর দেহের পাশ থেকে একটি পাকানো নাইলনের দড়ি পেয়েছে পুলিশ। একতলার একটি ঘরের দু’টো আলমারির দরজা খোলা ছিল। দেরাজেরও ‘লক’ ভাঙা ছিল। আলমারি থেকে নগদ টাকা বা গয়না মেলেনি। সেগুলি লুঠ করা হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশের সন্দেহ। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্তে সকলের মাথায় চোট মিলেছে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর।
পুলিশ জেনেছে, ওই রং মিস্ত্রিরা হিন্দিভাষী। এ দিন সকাল থেকে তাঁদের খোঁজ মিলছে না। তবে আরও এক রং মিস্ত্রির থেকেই বাসিন্দারা খুনের ঘটনা টের পান। সকাল দশটা নাগাদ সেই ব্যক্তি বাড়িতে ডাকাডাকি করেও কারও সাড়াশব্দ না পেয়ে পড়শিদের জানান। পড়শিরা বাড়িতে ঢুকে তিনটি দেহ দেখে পুলিশে খবর দেয়। এরপরেই ওই রংমিস্ত্রিকেও জেরা করার জন্য পুলিশ থানায় নিয়ে গিয়েছে। বাকিদের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।
এ দিন দুপুরে পুলিশ কুকুর নিয়ে যাওয়া হয় ঘটনাস্থলে। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ জানিয়েছে, খুনের পরে দুষ্কৃতীরা কোন পথে পালিয়েছে, তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। যে ঠিকাদারদের মাধ্যমে মিস্ত্রিদের খোঁজ পেয়েছিলেন প্রদীপবাবু, সেই ব্যক্তিকেও পুলিশ খুঁজছে।
যদিও সোমবারের কয়েকটি ব্যাপারে ধন্দে পড়েছেন প্রদীপবাবুদের প্রতিবেশীরা। সোমবার বিকেল পাঁচটা নাগাদ প্রসেনজিৎ মোড়ের এক দোকান থেকে এক কেজি মুরগির মাংস কিনেছিলেন। মাংস বিক্রেতা মিঠুন সরকার জানিয়েছেন, সাধারণত বর্ধন বাড়িতে পাঁচশো গ্রাম মাংস কেনা হত। সোমবার বেশি মাংস কিনতে চাওয়ায় বিস্মিত হন মিঠুনবাবু। তাঁর কথায়, ‘‘আমি জানতে চাইলে পাপাই (প্রসেনজিতের ডাক নাম) বলে বাড়িতে লোক আছে।’’ সন্ধে ৬টা নাগাদ দীপ্তিদেবীও বাজার থেকে মুদির জিনিসপত্র কিনেছিলেন বলে পড়শিরা জানান। তবে পড়শিদের দাবি, সন্ধের পর থেকে বাড়িতে কাউকে ঢুকতে বা বের হতে দেখা যায়নি। তাই কাদের জন্য মাংস রান্নার প্রস্তুতি চলছিল, তা নিয়েই রহস্য তৈরি হয়েছে।
দীপ্তিদেবীর ভাই উত্তম দে এ দিন বলেন, ‘‘ওরা কোনও ঝগড়া বিবাদে থাকত না। প্রচুর টাকা-পয়সাও ছিল না। তবে সম্প্রতি জামাইবাবু অবসরের পরে পাওয়া টাকা দিয়ে শখ করে বাড়ি তৈরি শুরু করেছিলেন।’’ জানা গিয়েছে, মাটিগাড়ার শরৎপল্লি এলাকায় প্রদীপবাবুর তিন কাঠা একটি জমি ছিল। সেই জমি বিক্রির কথাও চলছিল বলে বাসিন্দাদের দাবি।