ছাত্রীর মৃত্যু ঘিরে রণক্ষেত্র রুপাহার

ট্রাকের ধাক্কায় এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল রায়গঞ্জের রুপাহার এলাকা। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ ওই ছাত্রীর মৃত্যুর পর স্থানীয় বাসিন্দারা মৃতদেহ আটকে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের দুই ধারে মাটি ফেলার দাবিতে পথ অবরোধ শুরু করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ বিরাট বাহিনী পৌঁছলে বাসিন্দাদের একাংশ পুলিশকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় তিনঘন্টা ধরে পুলিশ বাসিন্দাদের বোঝানোর চেষ্টা করেও পথ অবরোধ তুলতে ব্যর্থ হয়।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০১৫ ০৩:১৫
Share:

রুপাহারে জাতীয় সড়কের উপরে পড়ে রয়েছে ছাত্রীর দেহ। শুক্রবার গৌর আচার্যের তোলা ছবি।

ট্রাকের ধাক্কায় এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল রায়গঞ্জের রুপাহার এলাকা। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ ওই ছাত্রীর মৃত্যুর পর স্থানীয় বাসিন্দারা মৃতদেহ আটকে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের দুই ধারে মাটি ফেলার দাবিতে পথ অবরোধ শুরু করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ বিরাট বাহিনী পৌঁছলে বাসিন্দাদের একাংশ পুলিশকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় তিনঘন্টা ধরে পুলিশ বাসিন্দাদের বোঝানোর চেষ্টা করেও পথ অবরোধ তুলতে ব্যর্থ হয়।

Advertisement

এই পরিস্থিতিতে বিকাল পৌনে চারটে নাগাদ আন্দোলনকারী বাসিন্দাদের একাংশ পুলিশের অনুরোধে পথ অবরোধ তোলার সিদ্ধান্ত নিলেও বাসিন্দাদের অপর একটি গোষ্ঠী অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। সেই সময় বাসিন্দাদের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সেই সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে জখম হন রায়গঞ্জ থানার সাব ইন্সপেক্টর পুলক দাস ও কর্ণজোড়া পুলিশ ফাঁড়ির ওসি পিনাকী সরকার। তাঁদের ধাক্কাধাক্কি করা হয় বলে অভিযোগ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এরপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে বাসিন্দাদের ছত্রভঙ্গ করে কোনওরকমে মৃতদেহটি উদ্ধার করে রায়গঞ্জ জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। কিছুক্ষণ পর ফের পথ অবরোধ শুরু করেন বাসিন্দারা। অবশেষে বিকাল সাড়ে ৪টা নাগাদ পুলিশ ওই এলাকার জাতীয় সড়কের দুইধারে চার ট্রাক মাটি ফেললে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

Advertisement

দুর্ঘটনার পর বাসিন্দারা ধাওয়া করে ট্রাকটিকে আটক করে ভাঙচুর করার পর তার চালককে গাড়ি থেকে নামিয়ে বেধরক মারধর করেন বলে অভিযোগ। সুযোগ পেয়ে প্রাণ বাঁচাতে জখম অবস্থায় চালক জাতীয় সড়কের ধারের একটি জমির উপর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন রুপাহার তেঁতুলতলা এলাকার ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের দুই ধারের মাটি ধসে গিয়েছে। এদিন সাইকেল আরোহী ওই স্কুলছাত্রী এই কারণেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

উত্তর দিনাজপুরের পুলিশ সুপার সৈয়দ ওয়াকার রেজা বলেন, ট্রাকটিকে আটক করা হয়। ট্রাক চালকের খোঁজে তল্লাশি চলছে। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ জানিয়েছে, এদিন ওই স্কুলছাত্রী সাইকেল নিয়ে রুপাহার তেঁতুলতলা এলাকার একটি গ্রামীণ সড়ক থেকে জাতীয় সড়কে ওঠার সময়ে জাতীয় সড়কের ধারের গর্তে চাকা আটকে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায় ওই ছাত্রী। সেই সময় মালদহগামী দশ চাকার ট্রাকটি তার মাথা পিষে দিলে ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়।

পুলিশ জানিয়েছে, মৃত ওই ছাত্রীর নাম ঝর্ণা বর্মন(১৭)। রায়গঞ্জ থানার উত্তর পালইবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ঝর্ণা এ বছর স্থানীয় মাড়াইকুড়া ইন্দ্রমোহন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কলা বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। তার বাবা জয়দেববাবু ও মা কল্পনাদেবী বাড়ি সংলগ্ন হাতিয়া হাটখোলা এলাকায় চায়ের দোকান করে সংসার চালান।

ঝর্ণার একমাত্র ভাই সাহেব হাতিয়া হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। সংসারে আর্থিক অনটন থাকা সত্বেও ঝর্ণা ২০১৩ সালে হাতিয়া হাইস্কুল থেকে ৭৫ শতাংশেরও বেশি নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করে। সম্প্রতি, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ঝর্না রুপাহার এলাকার একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হয়। এদিন ওই কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এক বান্ধবীকে উত্তর রুপাহার এলাকায় পৌঁছে দিয়ে ঝর্না বাড়ি ফিরছিল।

ঝর্ণার জেঠু বিশ্বজিৎ বর্মন বলেন, ‘‘ভাইঝি ওর বান্ধবীকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সাইকেল নিয়ে গ্রামীণ সড়ক থেকে অনেকটা উঁচু জাতীয় সড়কে ওঠার সময়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায়। জাতীয় সড়কের দুই ধারে মাটি দিয়ে সমান করা থাকলে ভাইঝির মৃত্যু হত না।’’

আন্দোলনকারী বাসিন্দাদের তরফে সন্তু সরকার, মনা বর্মন, রুপা সরকাররা বলেন, ‘‘জাতীয় সড়কের দুই ধারে মাটি না থাকায় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গ্রামীণ সড়ক থেকে জাতীয় সড়কে ওঠার সময়ে মাঝেমধ্যেই সাইকেল ও বাইক উল্টে বাসিন্দারা জখম হন।’’

প্রায় এক মাস আগে একইভাবে ট্রাকের ধাক্কায় সাইকেল আরোহী স্থানীয় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। হাতিয়া হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক গৌতম সিংহ ও ইন্দ্রমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক নির্মল সরকার এদিন খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থলে যান। তাঁরা বলেন, ‘‘অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ঝর্ণা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল! এরকম একজন কৃতী ছাত্রীর অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না।’’ পুলিশ সুপার জানান, ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রুখতে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষকে নজরদারি রাখার জন্য অনুরোধ জানাবেন। দ্রুত মাটি ফেলার জন্যেও বলা হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement