Durga Puja 2021: রোজ বদলে যায় শব্দ, হারিয়ে যায় বন্ধু-স্বর

গত দু’বছরে শরতের শব্দগুলি পালটে গেল। প্রিয় বন্ধুর কণ্ঠস্বর আর শুনতে না পাওয়া এই মন চাইলেও আর শরতে মেখে থাকা ভীষণ চেনা শব্দগুলি চিনতে পারে না।

Advertisement

চৈতালি বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২১ ০৮:২৮
Share:

ফাইল চিত্র।

গত কয়েক মাস ধরে একটাই শব্দ শুনতে পাচ্ছি। দু’হাতে কান চাপা দিয়ে রাখলেও, মোবাইল তারে উচ্চ নাদে শব্দ চালিয়ে রাখলেও শুনতে পাচ্ছি। ঠিক যেন নিজের ভিতর থেকে উঠে আসা হাতুড়ি পেটানোর শব্দ।

Advertisement

অথচ, এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেলে পাখির ডাক শুনতে পেতাম। গলির মোড়ের রাস্তা থেকে রেডিয়োয় ভেসে আসা কৃষ্ণ নামগান শুনতে পেতাম। সকালের রোদ পেয়ে বেড়ে ওঠা টবের গাছগুলি হাওয়ায় সরসর করে হেসে ওঠার শব্দ পেতাম। পাশের বাড়ির বারান্দায় নিপুণ হাতে টিপ করে ছোড়া খবরের কাগজ মেঝেয় পড়ার ঝুপ শব্দ শুনতে পেতাম।

কিন্তু সে সব হঠাৎই যেন বদলে গেল অস্থিরতার শব্দে। কর্কশ মৃত্যুর শব্দে। এ কি শব্দের অসুখ? নাকি আমাদের শোনার?

Advertisement

গৌতম বুদ্ধের ‘ধম্মপদ’ বলে, ‘আমরা এখানে কলহে সময় নষ্ট করছি। অনুক্ষণ আমরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছি। কলহপ্রিয় লোকেরা তা বোঝে না। যারা তা বোঝে, তারা কলহে সময় নষ্ট করে না।’ তবে কি হৃদ্স্পন্দনের শব্দটুকু ছাড়া বাকি সবই অনর্থক, কলহের সমান? আমরা কি তবে এই সময়ের অস্থির আবহে শ্রবণেন্দ্রিয়কে শুধুই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ বলে ধরে নেব? যার সঙ্গে এখন পাকে পাকে জড়িয়ে গিয়েছে আইসিইউ-তে থাকা মনিটরের শব্দ।

অথচ, এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। শরতের নীল আকাশে তুলো তুলো মেঘের ভেলায় চড়ে অপু-দুর্গার মতো কাশের বনে রেলগাড়ি চলতে শোনাই তো কাঙ্ক্ষিত ছিল। বা ঘুমের ভিতর মন্দ্রিত কণ্ঠে স্তোত্রগান আর ঢাক-কাঁসরের শব্দের গলা জড়ানো আদর। পুজোর মুখে আম্বুল্যান্স-আর্তনাদ কি চেয়েছি কখনও?

কিন্তু গত দু’বছরে শরতের শব্দগুলি পালটে গেল। প্রিয় বন্ধুর কণ্ঠস্বর আর শুনতে না পাওয়া এই মন চাইলেও আর শরতে মেখে থাকা ভীষণ চেনা শব্দগুলি চিনতে পারে না। উল্টে পড়শি দেশে বিমান উড়ে যাওয়ার মুহূর্তে ঝুপ করে কিছু মানুষের শূন্য হয়ে যাওয়ার শব্দ, ঝড় থেমে গেলে ঘরের ভিতরে খিদের জ্বালায় বাচ্চার কান্নার শব্দ, তাকে থামাতে ত্রাণের লাইনে দাঁড়ানো অসহায় মায়ের জোরে ঝাঁঝানির শব্দ জন্ম নেয়, ক্রমাগত। মিশে যায় বুকে হাতুড়ি পেটার শব্দের সঙ্গে। মিশে যায় শবদেহবাহী গাড়ির শব্দের সঙ্গে।

গভীর নৈঃশব্দ্য জন্ম দেওয়া এই সময় তবু কান পাতে। যদি শোনা যায় কোনও শান্তির শব্দতরঙ্গ! পুরাণে আছে, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর মিলিত মন্ত্রোচ্চারণের শব্দে ত্রিলোক কাঁপিয়ে জন্ম হয় মহিষাসুরমর্দিনীর। মহামায়ার।

কিন্তু বাংলার ঘরে তো দেবী হয়ে যান মানবী। দুর্জ্ঞেয়ও। নয়তো সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরে কেন ঘরের মেয়েকে কালশিটে লুকোতে হয় মা-বাবার কাছে? কেনই বা কোনও দুর্গা ফিরে আসেন স্রেফ দেহটি হয়ে, নিষ্প্রাণ? পণের জন্য খোঁটা কি কৈলাশেও বরাদ্দ ছিল পার্বতীর?

এই শব্দ কি শুনেছেন? বা এই নৈঃশব্দ্য?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement