—প্রতীকী চিত্র।
নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে একটি চিতাবাঘের সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করে পাঁচ বছরের নাতনি এবং পোষ্যের জীবন রক্ষা করলেন ষাটোর্ধ্ব দেবিকা শেরপা৷ দার্জিলিঙের লোয়ার ভুটিয়া বস্তির দেবকোটা গ্রামের বাসিন্দা দেবিকা গুরুতর আহত হয়েছেন। চিতাবাঘের হানায় তাঁর মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষত তৈরি হয়। বর্তমানে তিনি শিলিগুড়ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সেই রোমহর্ষক লড়াইয়ের বিবরণ দিতে দিতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন বৃদ্ধা।
দেবিকা জানান, চিতাবাঘটি আচমকাই তাঁদের বাড়ির ভিতরে ঢুকে তাঁর নাতনি এবং পোষ্য সারমেয়কে হামলা করে। দোতলার একটি ঘরে ছিলেন দেবিকা। বিষয়টি বুঝতে পেরে নীচে নেমে আসেন৷ তা দেখে বাঘটি হঠাৎ তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেবিকা যদিও হার মানেননি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি যদি পিছিয়ে যেতাম বা সামনে এগিয়ে যেতাম, চিতাবাঘটি আমাকে মেরেই ফেলত। ভাবলাম মরতে হলে লড়াই করেই মরব। একতলায় আমার ছোট নাতনিও ছিল। তাকে যে বাঁচাতেই হত।’’
তার পরে ঘরে থাকা লাঠি তুলে নেন দেবিকা। বুনো জন্তুটি যত বার তাঁর উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেছিল, তত বারই তিনি সর্বশক্তি দিয়ে সেটিকে আঘাত করতে থাকেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে পশু ও মানুষের লড়াই। দেবিকা বলেন, ‘‘লড়াই করতে করতে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, শেষ পর্যন্ত আর হাত তোলার ক্ষমতা ছিল না। তবে অনবরত লাঠির ঘা খেয়ে চিতাবাঘটিও এক সময়ে লাফানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল।’’
এই জীবন-মরণ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত দেবিকা নিজের এবং পরিবারের প্রাণরক্ষা করতে পারলেও বন দফতরের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। খবর পাওয়ামাত্রই বন বিভাগের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে জানা গিয়েছে যে, ওই এলাকারই একটি ছোট খাঁজ বা ওডারের মতো নিরাপদ জায়গায় চিতাবাঘটি আপাতত লুকিয়ে রয়েছে। ভিডিয়ো ফুটেজেও দেখা গিয়েছে, চিতাবাঘটি একটি সংকীর্ণ জায়গায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
দেবিকা শেরপা৷ —নিজস্ব চিত্র।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই দেবিকার প্রশ্ন, ‘‘যদি কোনও মানুষ বন্যপশুকে আঘাত করে, তবে বন বিভাগ সঙ্গে সঙ্গে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু যখন এই ধরনের হিংস্র বন্যপ্রাণী জনবসতিতে ঢুকে এ ভাবে হামলা চালায় এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে, তখন বন বিভাগ সাধারণ মানুষের জন্য কী পদক্ষেপ নেয়?’’ তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘‘পাহাড়ের এই এলাকায় চিতাবাঘের উপদ্রব দীর্ঘদিনের। এর আগেও চিতাবাঘ লোকালয়ে এবং আমার বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াত। আমার একটি ছাগলের খামার ছিল। চিতাবাঘ সেটি সাবাড় করে দিয়েছে। এই বিষয়ে আগে একাধিক বার বন বিভাগে অভিযোগ জানালেও কোনও স্থায়ী সমাধান মেলেনি।’’
এলাকার মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে চিতাবাঘটিকে অবিলম্বে খাঁচাবন্দি করে বা অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বন বিভাগের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
বন বিভাগের আধিকারিকদের মতে, চিতাবাঘটি এই মুহূর্তে অত্যন্ত উত্তেজিত এবং খিটখিটে মেজাজে রয়েছে। এই অবস্থায় অবিলম্বে ধরার বা উদ্ধার করার চেষ্টা করলে সে উদ্ধারকারী দলের উপর উল্টে আক্রমণ করতে পারে, অথবা আরও বেশি হিংস্র হয়ে লোকালয়ের অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণে, এই মুহূর্তে চিতাবাঘটিকে উদ্ধার করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপযুক্ত সুযোগ পাওয়ামাত্রই তাকে সুরক্ষিত ভাবে উদ্ধার করা হবে।