হামিদের শেষযাত্রায় শোকার্ত আত্মীয়-পরিজনেরা। কোচবিহারের বড়াইবাড়ি গ্রামে তোলা নিজস্ব চিত্র।
আর সালিশি সভা নয়, আব্দুল হামিদের শেষযাত্রায় সে শপথই নিল বড়াইবাড়ি গ্রাম। মঙ্গলবার দুপুরে দলে দলে মানুষ গিয়েছে হামিদের বাড়িতে। প্রত্যেকের মুখে একই বক্তব্য, “গ্রামে সালিশি সভা করা হবে না। কোনও ঘটনা হলে আমরা পুলিশ, আদালতের দ্বারস্থ হব।” গ্রামের তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য দোলন দাস বলেন, “সালিশি সভা না হলে হয়তো হামিদ খুন হতেন না, এ রকম এক জন প্রতিবাদী যুবকের খুন হয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছি না। আর কখনও গ্রামে সালিশি সভা বসাব না। কিছু হলে পুলিশকে খবর দেব।”
মঙ্গলবার হামিদ খুনের ঘটনায় পুলিশ আরও ৩ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। সোমবার প্রধান অভিযুক্ত জব্বার আলিকে ধরে পুলিশ। পুলিশ জানায়, ধৃত বাকি তিন জনের নাম আজিজুল মিঁয়া, রফিজুল মিঁয়া এবং মোজাব্বর মিঁয়া। প্রথম দুই জন জব্বার আলির ছেলে। তৃতীয় জন শ্যালক। কোচবিহারের পুলিশ সুপার রাজেশ যাদব বলেন, “অভিযুক্ত চার জনকে ধরা হয়েছে। একজনকে খোঁজা হচ্ছে।”
গত সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ সালিশি সভায় কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয় বড়াইবাড়ির তৃণমূল নেতা আব্দুল হামিদকে। ঘটনায় তৃণমূলের এক পঞ্চায়েত সদস্যের স্বামী দলের আমবাড়ি অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত দাস সহ আরও তিন জনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। তাঁদের মধ্যে দু’জন কোচবিহার এমজেএন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ দিন ময়নাতদন্তের পর হামিদের দেহ গ্রামে নিয়ে যেতেই কয়েক হাজার মানুষ ভিড় করেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে হামিদের পরিবারের সদস্যেরা। তাঁর মা সাহেরন বিবি, বাবা কহিনুর মিয়াঁ, দিদি কছিরন বিবির দাবি, “পরিকল্পিত ভাবে হামিদের উপরে হামলা করা হয়েছে।”
কছিরন বিবির বক্তব্য, “আগের দিন রাতেই হামিদকে কী ভাবে খুন করা হবে সেই ছক তৈরি হয়েছিল। জব্বার মিঁয়ারা সেই মতোই কুড়ুল সহ অস্ত্র তৈরি রেখেছিলেন। সালিশি শুরু হতেই হামলা করা হয়। দাদা হাইরুল ভাইকে বাঁচাতে গেলে তাঁকে কোপানো হয়।” তিনি জানান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলায় হামিদের উপরে অনেকের রাগ ছিল। জব্বার কয়েক বার হামিদকে হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “তাই আমরা বার বার বলেছিলাম সালিশি সভায় না যেতে। কিন্তু শুনল না।”
কোচবিহার শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বড়াইবাড়ি। ঘটনার পরে গোটা জেলা জুড়েই সালিশি সভা বন্ধের দাবিতে সরব হয় বিদ্বজ্জনেরা। এ দিন তাঁর প্রতিধ্বনি শোনা যায় ওই গ্রামেও। হামিদের পরিবারের সদস্যরা তো বটেই, গ্রামের বাসিন্দা তৃণমূলেরা নেতা-কর্মীরা সকলেই সালিশি আর না করার পক্ষে সওয়াল করেন। তৃণমূল নেতা সুব্রত দে বলেন, “সালিশি করতে গিয়ে এ ভাবে হামিদকে খুন করা হবে ভাবা যায়নি। এই ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। আর সালিশি হবে না।” গ্রাম জুড়ে এদিন ছিল থমথমে ভাব। গ্রামের বাসিন্দারা অভিযুক্তদের ফাঁসির সাজার দাবিতে সরব হন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে আজ, বুধবার এলাকায় শান্তি মিছিলের ডাক দেওয়া হয়। স্মরণসভাও করা হবে।