কাপুরুষ-মহাপুরুষের পঞ্চাশ বছর
অমিতাভ রায়ের ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। হাতে একটা ছোট বাক্স। স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছেন। গভীর চিন্তায় ডুবে। ক্যামেরায় রয়েছেন সৌমেন্দু রায়। দৃশ্যগ্রহণের তদারকি করছেন স্বয়ং পরিচালক সত্যজিৎ রায়। মাঝেমধ্যে সৌমিত্রের ঘাড়ে হাত রেখে কী যেন বোঝাচ্ছেন। ডুয়ার্সের ওদলাবাড়ি রেল স্টেশনে ১৯৬৪ সালে এমন ঘটনার সাক্ষী ছিলেন অনেকেই। সিনেমার নাম কাপুরুষ-মহাপুরুষ। এ বছর সেই ঘটনার ৫০ বছর পূরণ হল। সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ৭ মে ১৯৬৫তে।
কাপুরুষের সিংহভাগই মালবাজার এবং ওদলাবাড়িতে চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ডুয়ার্সের চা বাগান, পাহাড়ি ঝোরায় বেশ কিছু দৃশ্যগ্রহণ করা হয়েছে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের জনৈক কাপুরুষের কাহিনি গল্প অবলম্বনে তৈরি সিনেমাতে সৌমিত্র ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।
মালবাজারের এই ছাত্রী আবাসে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল মানিকববুর পুরো ইউনিটের। ছবি: সব্যসাচী ঘোষ
সত্যজিৎ রায়ের পুরো ইউনিট মালবাজারের সুভাষিণী উচ্চ বিদ্যালয়ের হস্টেলে প্রায় মাসখানেক কাটিয়েছে। ব্যবহার করা হয়েছিল ওদলাবাড়ির অধুনা লুপ্ত কনক টকিজ। উত্তর পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে, সুভাষিণী বালিকা বিদ্যালয়ের হস্টেল কিংবা ওদলাবাড়ির কনক টকিজ সিনেমার কৃতজ্ঞতা স্বীকারে সব কিছুরই নাম উল্লেখও করেন পরিচালক।
আজও ‘কাপুরুষ-মহাপুরুষ’ সিনেমার কথা উঠলে মালবাজার-ওদলাবাড়ির প্রবীণরা স্মৃতিমেদুর হয়ে যান। এমনই একজন মালবাজারের দিলীপ দত্ত। সে সময় তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সুভাষ মোড় লাগোয়া এলাকায় সামনে পেয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিত রায়কে। চেয়ে নেন অটোগ্রাফও। ওদলাবাড়ির দুলাল শিকদার তখন যুবক। ভিড় ঠেলে কাছাকাছি দেখেছিলেন ৬ ফুট উচ্চতার বিশ্ববন্দিত পরিচালককে।
ওদলাবাড়ি রেল স্টেশনে শুটিং করার দৃশ্যের যদি কোন ছবি পাওয়া যায় তা রেল তা সংগ্রহে রাখতে চায়। অর্ধ শতাব্দী পর ছবি খোঁজার কাজও চলছে বলে জানান আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের এডিআরএম বনিশেস লাকড়া। সুভাষিণী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা করবী দাসের কথায়, “স্কুল যে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় জড়িয়ে রয়েছে এবং তা যে এবার অর্ধ শতাব্দীতে পড়ল। সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি রক্ষার্থেও কিছু করার কথা ভাবা হচ্ছে।”
নামে সীমাবদ্ধ হেরিটেজ সিটি
অরূপজ্যোতি মজুমদার।
‘হেরিটেজ সিটি’ কোচবিহার। ক্রমশ তা যেন নামেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ উপলব্ধি অরূপজ্যোতি মজুমদারের। তাই আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ভাবতে শুরু করলেন তিনি। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ২০০৮ সালে তিনি গড়ে তুললেন কোচবিহার হেরিটেজ সোসাইটি। পেশায় সরকারি কর্মী হয়েও যে নিজ মাতৃভূমির জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা যায় তাই করে দেখালেন অরূপবাবু। অরূপবাবু সম্পর্কে প্রয়াত সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদারের ভাইপো। কয়েকজনকে সঙ্গী করে একের পর এক চিঠি, স্মারকলিপি, সওয়াল করে অস্থির করে তুলেছেন আমলা থেকে নেতা, মন্ত্রীদের। ফলও পেয়েছেন। কোচবিহার স্টেশনে গড়ে উঠছে রেল মিউজিয়ম। যেখানে কোচবিহার রাজ আমলের রেল চিত্র কিছুটা হলেও উঠে এসেছে। অরূপবাবু সে জন্য ধন্যবাদ জানান, এক সময়ের রেলমন্ত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। পূর্ত দফতরের মিউজিয়মের দাবিতেও সরব হন তাঁরা। সে কাজও অনেকটা এগিয়েছে। রাজবাড়ির অস্ত্রাগার থেকে শুরু করে রাজ আমলের মুদ্রা নিয়েও কেশব সেনের মেয়ের স্মৃতি বিজড়িত সাবিত্রী লজ সংস্কারের ব্যাপারেও সরব সোসাইটি। নল রাজার গড়, খেন রাজাদের শীতলাবাস সে সব নিয়েও নজর কাড়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। রাজস্থানে ঐতিহ্যমন্ডিত ভবনগুলিতে ব্যবহার করে পর্যটনকে ভিন্ন মাত্রা দেওয়া হয়েছে। তা হলে কোচবিহারে কেন হবে না? এ প্রশ্নেই লড়াই চলছে অরূপবাবুদের। অবশ্য লড়াইয়ের সংস্কৃতি কোচবিহারের রয়েছে।
পাসাঙ্গ তামাঙ্গ
পাসাঙ্গের চায়ের দোকান
কাকভোরে যাঁরা চৌরাস্তা-ম্যালে সূর্যোদয় দেখতে আসেন। তাঁদের মাঝেমধ্যেই নিরাশ হতে হয়। কখনও হয়ত কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়, কখনও বা কুয়াশা। গ্রীষ্মের সকালেও বৃষ্টি নেমে যায়। কোনও সকালে সূর্যোদয়ের দেখা না গেলেও, ঝড়-বৃষ্টি, মেঘ-কুয়াশার মধ্যেও এক জনের দেখা মিলবেই। তিনি পাসাং তামাঙ্গ। বয়স ৫৬। সকাল ৬টার মধ্যে চৌরাস্তায় চলে আসেন পাসাং। একটি দেরি হলেই, তাঁর খোঁজখবর শুরু করেন প্রাতর্ভ্রমণকারীরা। কেউ কেউ ফোন করে তিনি আসছেন কিনা জেনে নিয়ে অপেক্ষা করেন। প্রায় ১৯ বছর ধরে চৌরাস্তায় খোলা আকাশের নীচে চায়ের দোকান চালাচ্ছেন তিনি। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী সহ চার জনের সংসার। দোকান চালিয়েই ছেলে মেয়ের পড়ার খরচ জুগিয়েছেন। মেয়ে স্নাতক, ছেলে একাদশ শ্রেণির ছাত্র। ভরা পর্যটনের মরসুমে আয় কিছুটা বেশি হয়। গড়ে দিনে অন্তত ৫০০ কাপ চা বিক্রি হয়। পর্যটন মরসুমে ৭০০ কাপ। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চা বিক্রেতাদের সঙ্গে ছবিও তুলতে দেখা যায় অনেক পর্যটকদের। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও এই পাসাং সহ অন্য চা বিক্রেতারা জনপ্রিয়। পাসাঙের কথায়, “চৌরাস্তায় জগিং সেরে অনেকে এই দোকান থেকে চা খেয়ে বাড়ি ফেরেন। প্রতিদিন কত নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে, কত রকম ভাষা শুনতে পাই। এই সবই আমাকে কাকভোরে টেনে আনে ম্যাল চৌরাস্তায়।
সংরক্ষণ ও নিরীক্ষণ
জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত হল পক্ষী নিরীক্ষণ ও সরক্ষণ শিবির। শিবিরের উদ্দেশ্য ছিল পরিযায়ীদের তথ্যপঞ্জি তৈরি করা। তাদের প্রথম আসার কারণ নিণর্র্য় এবং সচেতনা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ। এ বছর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে করলা নদীর বুকে ভিড় জমিয়েছিল পরিযায়ীর দল। প্রধানত লিজার হুইশেলিং ডাক এবং নুরহেল — এই দুই প্রজাতির পরিযায়ী দেখা গেছে। সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক রাজা রাউত জানান, ‘করলার বুকে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার সীমানার মধ্যে পরিযায়ীদের দেখা গেছে। এই অঞ্চলে এরা সম্ভবত প্রথম এল। যে পাখিগুলিকে অসময়ে এখানে দেখা গেল, তারা সাধারণ ভাবে শীতকালে আসে। এদের বাসস্থান সাইবেরিয়া, চিন বা ভুটান। অসময়ে এদের আসার কারণ পরিবেশজনিত সমস্যা, বিশ্ব উষ্ণায়ন বা খাদ্যাভাব হতে পারে। তবে করলায় এদের আসা থেকে মনে করা যায়, নদী এখন অনেকটাই দূষণমুক্ত।’ তিনি বলেন, ‘‘যে অঞ্চলে এদের দেখা গেছে, আমরা সে অঞ্চলের বিশেষত যুবসম্প্রদায়কে সচেতন করেছি, যাতে পাখি এবং নদীর মাছ বাঁচিয়ে রাখা যায়। চেষ্টা করা হচ্ছে ছোট ছোট দল তৈরি করে করলার জীববৈচিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার।
দু’দিনের আলোচনাচক্র
‘স্বাধীনতা উত্তর দুই বাংলার কথাসাহিত্য, প্রকরণ ও প্রবণতা’ শীর্ষক দু’দিনের আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রের আয়োজন করেছিল গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। এই আলোচনাচক্রের সূত্র-ভাষণ দেন ও পার বাংলার কথাকার হাসান আজিজুল হক। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতা—স্বাধীনতা উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করেছিল। স্বাগত ভাষণ দেন বিভাগীয় প্রধান সুনিমা ঘোষ। উপাচার্য গোপাল মিশ্রের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অধ্যাপক সৌরেন বন্দ্যোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন ও পার বাংলার সাহিত্যিক নাসরিন জাহান। এর পর এ পার বাংলার দুই কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র ও শচীন দাশ স্বাধীনতা উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের পর্ব থেকে পর্বান্তরের বিষয় বৈচিত্র্যের প্রতি আলোকপাত করেন। বিষয় হিসেবে আলোচিত হয়েছে নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কথাসাহিত্য, ছিন্নমূলের আখ্যান, গোষ্ঠীজীবনের কথাসাহিত্য, নিম্নজীবীদের জীবনসংস্কৃতি ও বাংলা কথাসাহিত্যের হাল-হকিকৎ। বিষয়গুলিতে আলোকপাত করেন রবিন পাল, জ্যোৎস্না চট্টোপাধ্যায়, প্রিয়কান্ত নাথ, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, উদয়চাঁদ দাশ প্রমুখ অধ্যাপক-অধ্যাপিকা। অনুষ্ঠান শেষ হয় দুই বাংলার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।
ও গঙ্গা তুমি
মোটরবাইক বনাম মালদহের আম আর বনগাঁ থেকে চুরি যাওয়া চালুন্দিয়া নদী। গত বছর কেদারনাথের মতোই দার্জিলিঙে বিপর্যয়ের আশঙ্কা। ঝাড়গ্রামে সিলিকোসিসে মরণাপন্ন পাথর খাদান শ্রমিক। বাঘের চোরাশিকার। দেশের বাইরে যে দেশ আছে, আর কলকাতার বাইরে যে বিপুল বাংলা, তাকেই দু’হাতে বেড় দিয়ে ধরেছে দ্বিমাসিক পত্রিকাটি। তবে এ বারের ‘দেশ পরিবেশ’ মে-জুন সংখ্যার প্রধান আলোচ্য ‘গঙ্গাপ্রাপ্তি’— ধারাবাহিক দূষণে সঙ্কটের অতলে তলিয়ে যেতে থাকা ভাগীরথীর আখ্যান।