এনবিএসটিসি ক্ষতিপূরণ দেয়নি, নালিশ আদালতে

গত ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায় পুরো পৃথিবীটাই উলটপালট হয়ে গিয়েছিল জলপাইগুড়ির ভক্তিনগর থানার কামারভিটার রবি রায়ের পরিবারের। দুঃস্থ পরিবারের একমাত্র রোজগেরে রবিবাবু রাজমিস্ত্রির কাজ সেরে সাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন।

Advertisement

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৪ অগস্ট ২০১৫ ০২:২৩
Share:

গত ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায় পুরো পৃথিবীটাই উলটপালট হয়ে গিয়েছিল জলপাইগুড়ির ভক্তিনগর থানার কামারভিটার রবি রায়ের পরিবারের। দুঃস্থ পরিবারের একমাত্র রোজগেরে রবিবাবু রাজমিস্ত্রির কাজ সেরে সাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। ইস্টার্ন বাইপাসের ঘোড়ামোড় এলাকায় উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের (এনবিএসটিসি) মালবাহী ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর জখম হন রবিবাবু। পরে শিলিগুড়ি হাসপাতালে মারা যান।

Advertisement

তিনজন নাবালক ছেলেকে নিয়ে কার্যত পথে বসেন স্ত্রী কুমিতাদেবী। সঙ্গী ছিলেন রবিবাবুর বৃদ্ধা মা অজাবালাদেবীও।

কিছুদিন সেই সময় পরিচিত কয়েকজনের চেষ্টায় সংসার চললেও ছোট ছোট ছেলেগুলিকে কাজকর্ম করতে নামতে হয়। অবশেষে এক পরিচিতের সুবাদে ২০০৮ সালে এনবিএসটিসি’র বিরুদ্ধে স্বামীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের মামলা করেন কুমিতাদেবী। প্রায় তিন বছর মামলা চলার পর তিনি মামলা জেতেন। ২০১১ সালে বিচারক মামলার রায়ে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা এবং ৯ শতাংশ হারে মামলা দাখিলের দিন থেকে সুদ দেওয়ার কথাও জানিয়ে দেয় আদালত। কিন্তু তা না পেয়ে ফের ২০১২ সালে মামলার পথে বেছে নেন কুমিতাদেবী। সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে এনবিএসটিসি’র পক্ষে কেউ হাজির হচ্ছিলেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে। উল্লেখ্য, সুদ-সহ ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বর্তমানে আড়াই লক্ষ টাকা মতো দাঁড়িয়েছে।

Advertisement

অবশেষে তিন বছর মামলার পর, গত সপ্তাহের গত ২০ অগস্ট অতিরিক্ত জেলা জজ-সেকেন্ড কোর্টের বিচারক চন্দ্রিমা মুখোপাধ্যায় এনবিএসটি-র ম্যানেজিং ডাইরেক্টর এবং শিলিগুড়ির ডিভিশন ম্যানেজারকে আদালতে হাজির থাকার জন্য সমন পাঠিয়ে আদালতে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালত সূত্রের খবর, গত কয়েকবছরের মামলার যাবতীয় তথ্য পর্যবেক্ষণ করে বিচারক ওই রায় দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে কেন মামলার এই পরিস্থিতি বা বিচারকের রায়ের পরও কতৃর্পক্ষ তা মানেননি তা জানতে চাওয়া হবে এনবিএসটিসি কতৃর্পক্ষের কাছে। তবে বিষয়টি দেখার জন্য আপাতত তিনি রাজ্য পরিবহণ দফতর নিয়ন্ত্রাধীন এনবিএসটিসিকে বিচারক কিছুটা সময়ও দিয়েছেন। আগামী ১৫ নভেম্বর শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।

এই প্রসঙ্গে এনবিএসটিসি’র ম্যানেজিং ডাইরেক্টর সুবলচন্দ্র রায় বলেন, ‘‘মামলা, ক্ষতিপূরণের নির্দেশের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। অবশ্যই খোঁজ নিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেব। আদালতের নির্দেশ মানা হবে।’’ আর কুমিতাদেবীর আইনজীবী সন্দীপ মণ্ডল বলেন, ‘‘রবিবাবুর অকাল মৃত্যুর পর পরিবারটি একসময় প্রায় ভেসে যেতে বসেছিল। মামলার জেতার সুবাদে কিছু টাকা পেলে পরিবারটির কাজে লাগত। কিন্তু এনবিএসটিসি কর্তৃপক্ষ যেভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছেন, এটা ঠিক নয়।’’ সন্দীপবাবু জানান, আদালতের হাজিরার নির্দেশের পর এবার হয়ত, এনবিএসটিসি কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে।

কামারভিটার বাসিন্দা মৃত রবিবাবুর এলাকায় রাজমিস্ত্রি হিসাবে কাজের সুনামও ছিল। স্ত্রী কুমিতাদেবী ছাড়াও বাড়িতে মা এবং তিন নাবালক ছেলে শ্যামল, বিশ্বজিৎ এবং রতন। মাসিক হাজার চারেক টাকা রোজগারে কোনও মতে চলত সংসার। নিজেদের ছোট বাড়িও রয়েছে। প্রতিদিন সকালে রবিবাবু সাইকেলে কাজে বার হতেন। ইস্টার্ন বাইপাস সংলগ্ন এলাকা ছাড়াও শিলিগুড়ির বিভিন্ন এলাকায় তিনি কাজ করতেন। প্রতিদিন কাজের পর সন্ধ্যায় সাইকেলে বাড়ি ফিরতেন। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনাটি ঘটে। এনবিএসটিসি’র একটি ট্রাক পিছন থেকে রবিবাবুকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর জখম অবস্থায় শিলিগুড়ি হাসপাতালের ভর্তি করানোর পর তিনি মারা যান।

এনবিএসটিসি সূত্রের খবর, বিভিন্ন ডিপো, গ্যারেজ থেকে যন্ত্রাংশ আনা নেওয়ার জন্য নিগমের কিছু ট্রাক রয়েছে। এমনই একটি ট্রাকের ধাক্কায় রবিবাবু মারা যান। তবে সংস্থার বাসের মতোই ট্রাকগুলির কোনওটারই পরিবহণ দফতরের বিশেষ নির্দেশ অনুসারে বিমা করানো নেই। ওই ট্রাকটিরও তাই ছিল না। এতে বিমার কোনও টাকাও রবিবাবুর পরিবার পায়নি।

কুমিতাদেবী জানান, ‘‘কোনওক্রমে সংসার চলে। ঘটনার পর নয় বছর কেটে গিয়েছে। ছেলেরা মিস্ত্রি, মজুরের কাজ করছে। বৃদ্ধ শাশুড়ি রয়েছে। সরকারি গাড়িতে ধাক্কা খেয়ে স্বামী মরল। তার পরে মামলা করেও জিতেও ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না। কবে টাকা পাব জানি না। গরিব মানুষ বলেই হয়ত হয়রান হতে হচ্ছে।’’

নিগম সূত্রের খবর, জহরলাল নেহেরু আর্বান রিনিউয়াল মিশনের আওতায় নতুন বাসগুলি আসার পরেই বাসের বিমা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিএসটিসি কর্তৃপক্ষ। পুরানো বাসগুলির বিমাও হবে বলে আধিকারিকেরা জানিয়েছেন। এতে আগামী দিনে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার রাস্তা অনেকটাই মসৃণ হবে বলে নিগমের অফিসারেরা জানিয়েছেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement