জলপাইগুড়ি নবাববাড়ি।
অতীত বাঁচাতে সংরক্ষণ জরুরি
• আমার জন্ম বেড়ে ওঠা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের শরিক হওয়া— সমস্ত কিছু এই শহরেই। বাবার হাত ধরে নাটক দেখতে যেতাম রবীন্দ্রভবনে, বান্ধব নাট্যে। বড় হয়ে কত গান, নাটক, আবৃত্তি করেছি সেখানে। প্রাচীন এই সাংস্কৃতিক কলাকেন্দ্রগুলিকে দেখলে ভারি মায়া হয়। এরা কত ইতিহাসের এরা সাক্ষী। অথচ এরা রয়ে গিয়েছে অনাদরে অবহেলায়। রক্ষণাবেক্ষণের কোনও চেষ্টাই দেখা যায় না। শহরের স্থাপত্যকীর্তির সব থেকে বড় নিদর্শন বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি। বছরের পর বছর ধরে আকর্ষণ করে চলেছে পর্যটকদের।
জলপাইগুড়ির স্থাপত্য ঐতিহ্যের আর এক নিদর্শন হল বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে বর্ণিত দেবী চৌধুরানীর মন্দির। জলপাইগুড়ির নবাববাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কিছু কম নয়। অথচ সবই সংরক্ষণ আর সংস্কারের অভাবে ধুঁকছে। এখন সব ঐতিহাসিক স্থাপত্যকর্মকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে সচেতন প্রয়াস প্রয়োজন তা কিন্তু এখনও দেখা যায় না। এই সব স্থাপত্যকে বাঁচাতে হাত মেলাতে হবে সবাইকে। উপলব্ধি করতে হবে এই স্থাপত্যকলার ঐতিহাসিক মূল্যকে। যদি টিকে থাকে এই সব স্থাপত্য নিদর্শন, তবে তা যেমন ইতিহাসকে বহন করবে তেমনি ভবিষ্যতে তা আকর্ষণ করবে আরও বহু পর্যটককে। কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে ঋদ্ধ হবে জলপাইগুড়িরর পর্যটনশিল্প। জীবিত থাকবে শহরের এই ঐতিহাসিক সমস্ত স্থাপত্য নিদর্শন।
সীমা চৌধুরী।
• শহর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যের চিহ্ন। পুরনো বাড়ি, মন্দির, মসজিদ, গির্জা স্মারকচিহ্ন বহন করছে অতীতকে। কিন্তু আজ সেই অতীতের কথাবলা স্মারকচিহ্নগুলো বিপন্ন। যেমন কয়েক বছর আগে ভেঙে ফেলা হল শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী সমাজপাড়ার ব্রাহ্মসমাজ মন্দির। আজ ক্রমশ ভেঙে পড়ার দিকে শহরের প্রাচীনতম বাড়ি, কোচবিহার রাজের ‘নৃপেন্দ্রনারায়ণ হল’। বর্তমানে বিদ্যালয় পরিদর্শকের দফতর এটি। ১৮৪৯ সালে ডালটন হুকার ‘জিলাপেগোরী’কে মিজারেবল কান্ট্রি বলেছিলেন। এর ১৬৫ বছর পরেও এই জলপাইগুড়ি মিজারেবলই থেকে গিয়েছে। রায়কতরাজ ধর্মদেব রায়কত (১৭০৯-২৪) শিকারপুর (বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গল) থেকে তাঁর রাজধানীটি তিস্তা নদীর পার্শবর্তী স্থানে নিয়ে আসেন। এটিকে জলপাইগুড়ি পত্তনের সূচনাবিন্দু ধরলে এর বয়স আজ ৩০০ বছর। সে সময় থেকে গত শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এই শহরের অধিকাংশ বাড়িই ছিল কাঠ ও খড়ের। রাজবাড়িটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে মন খারাপ হয়ে যায়। রাজবাড়ির একটি অংশ ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
১৮৬৯ সালকে নব্য জলপাইগুড়ির প্রশাসনিক সূচনাবর্ষ ধরা হয়। সে সময় প্রয়োজনে উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, ব্যবসায়ীরা এখানে আসতে থাকেন। অধিকাংশই এসেছিলেন জলপথে। জলপাইগুড়ি দিনবাজারের কালীবাড়ির ঘাট ছিল শহরের প্রবেশপথ। অতীতের এই স্মৃতি আজ বিস্মৃতির কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। নবাববাড়ি, নুরমঞ্জিল, প্রাচীন মসজিদগুলি এমন করেই ধরে রেখেছে শহরের প্রাচীন ইতিহাসকে।
কিন্তু ভূমিকলপ এ শহরের প্রাচীন ভবনগুলিকে বারেবারে ভেঙেছে। বারবার অগ্নিকাণ্ডে পুড়েছে এই শহর। ১৮৭৪ সালে নবগঠিত আদালত ভবনটি পুড়ে যায়। ১৮৯৮ সালে তৎকালীন সার্কিট হাউস, ১৯০৬ সালে ডেপুটি কমিশনারের অফিস, ১৯০৫এ দিনবাজার, পরে আবার ১৯১৪, ১৯২২ এবং ১৯৯৫ এবং সম্প্রতি বারে বারে পুড়েছে দিনবাজার। বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের ধাক্কায় অধিকাংশ প্রাচীন দালান মন্দির আজ আর নেই। তবুও রয়ে গিয়েছে অতীত ঐতিহ্য। তাই অতীতের সংরক্ষণ আজ জরুরি।
গৌতম গুহ রায়।
ছবি: সন্দীপ পাল।