জলের তলায় আনারস খেত।
কোথাও বিঘার পর বিঘা আনারসের খেত জলের তোলায়। কোথাওবা আবার আমন ধানের খেত কোথায় ছিল তা দেখাই যাচ্ছে না। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। বাদ পড়েনি সব্জি চাষও। কোনওখানে মাচা হেলে পড়েছে। কোথাওবার জলে ভেসে বেড়াচ্ছে ফুলকপি, ব্রোকলি বা বাধাকপির বীজতলা। গাছই ধুইয়ে গিয়েছে টমেটো, ধনেপাতার। গত তিনদিনের প্রবল বৃষ্টিতে শিলিগুড়ি মহকুমার গ্রামীণ এলাকায় কৃষি বলয়ে ব্যাপক ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষ করে মহকুমার খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া ব্লকেই মূলত ক্ষতির পরিমাণ বেশি। পুজোর মাসখানেক আগে টানা বৃষ্টিতে এই ক্ষতির জেরে মাথায় হাত পড়েছে চাষিদের। সোমবার সকাল থেকেই চাষিরা টেলিফোন তো বটেই কৃষি দফতরে এসে দরবার শুরু করেন। তার পরেই দফতরের তরফে মহকুমা জুড়ে সমীক্ষা চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট তৈরি করে এদিনই কলকাতায় পাঠিয়েছেন কৃষি অফিসারেরা। সরকারি সূত্রের খবর, গত তিনদিনে মহকুমার ধান, সব্জি এবং ফল মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে ফাঁসিদেওয়া, খড়িবাড়ি ব্লকেই ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকার মত। সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৯০০ হেক্টর কৃষি জমির।
কৃষি দফতরের শিলিগুড়ি মহকুমার অন্যতম সহ কৃষি অধিকর্তা মেহফুজ আলম বলেন, ‘‘পুজোর সময় বেশি লাভের আশায় প্রতিবছর এই সময়টা চাষিরা খেত ফসলে ভরিয়ে তোলেন। ধান থেকে সব্জি, ফল কিছুই বাদ থাকে না। কিন্তু ৭২ ঘন্টার এমন বৃষ্টি গত কয়েক বছরে হয়নি।’’ তিনি জানান, প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সবই জলের তলায় চলে গিয়েছে। আমরা দেখছি, কতটা কী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা যায়। কলকাতায় রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে।
সব্জি খেতেও একই অবস্থা।
গত শনিবার রাত থেকে গোটা উত্তরবঙ্গ তো বটেই দার্জিলিং জেলা জুড়ে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। আবহাওয়া দফতর সূত্রের খবর, শিলিগুড়ি মহকুমায় শনিবার ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। রবিবার থেকে এদিন বিকাল অবধি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮৬ মিলিমিটার। সন্ধ্যার পরেও বহু জায়গায় বৃষ্টি চলছে। কৃষি দফতরের অফিসারদের কথায়, গত কয়েক বছরে খুব বর্ষার সময়েও তিনদিনের ২০০-২৫০ মিলিমিটারের মত বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু, গত দিনের বৃষ্টির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৮ মিলিমিটার। যা স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই বেশি। আর তার জেরেই বিপাকে পড়ে গিয়েছেন মহকুমার কয়েক হাজার চাষি।
প্রতি বছর জুলাই মাস থেকে মহকুমার কৃষি বলয়ে আমন ধান চাষ হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এ ধান বাজারে আসে। এ ছাড়াও দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের আওতায় প্রায় ১ হাজার জমিতে উন্নত ধানের চাষ হয়েছে। এই সময় চলে বিঘার পর বিঘা জমিতে আনারস, কলা, পেপে এবং পেয়ারার চাষ। আবার পুজোর সময় আগে বাজার ধরার তাগিদে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, ব্রোকলি, বিনস, ধনেপাতার বীজতলা তৈরি করে চারা মূল জমিতে বোনা হয়। আবার মাচায় লাউ, ঝিঙে, শসা ছাড়াও পটল, ভেন্ডি ও বাঁধাকপির চাষ হয়। মহকুমার তিনদিনে সবই প্রায় জলের তলায় চলে গিয়েছে। সরকারি সূত্রের খবর, মহকুমায় আমন ধানের চাষ হয় প্রায় ২১ হাজার হেক্টর জমিতে। আর আনারস সাড়ে ৪ হাজার, সব্জি ৬ হাজার হেক্টর এবং ফল প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে থাকে। জলসেচ হওয়া জমিতে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা প্রতি হেক্টর এবং জল সেচ নেই এমন জমি’তে সাড়ে ৬ হাজার প্রতি হেক্টর হিসারে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়। ফাঁসিদেওয়ার প্রদীপ সিংহ বা মহম্মদ জাহিরেরা জানান, আনারসের ভাল দাম মিলছিল। তিনদিনের সব শেষ। গোটা খেত জলের তলায়। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। তেমনিই খড়িবাড়ির ফলচাষি নগেন সিংহ বা সুজিত বিশ্বাসেরা বলেন, ‘‘গাছ, খেত দেখে কষ্ট হচ্ছে। বাজারে ঋণও রয়েছে। কীভাবে মেটাবো জানি না।’’
সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় সব্জি চাষিদের। পুজোর আগাম বাজার ধরতে ‘আর্লি ভ্যারাইটি’ সব্জি চাষ করে এভাবে পথে বসতে হবে তা ভাবতেই পারছেন না বাসুচন্দ্র রায়, অনির্বাণ দাসেরা। তাঁরা জানান, বেশি লাভ তো দূরের কথা। খরচ বা পরিবার চালানো কী করে তা ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছি না। একই অবস্থা বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ধান চাষিরাও।
—নিজস্ব চিত্র।