গত দুই দশকে ডুয়ার্সের লাটাগুড়ি, ধূপঝোরার মতো এলাকায় পর্যটন ব্যবসার রমরমা বেড়েছে। অথচ স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি তাতে খুব একটা বদলায়নি। বরং কলকাতা, শিলিগুড়ির ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ সেখানে হোটেল, রিসর্ট গড়ে ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলের কারবার করে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে পাহারাদার, রান্নার কাজে সহায়ক, রিসর্ট দেখভালের দায়িত্বে কর্মী হিসাবে কাজ করছেন। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনব্যাপী শিক্ষণ এবং সম্প্রসারণ বিভাগের অধ্যাপক, গবেষক এবং ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে তৈরি একটি দলের সমীক্ষায় এমনটাই উঠে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, তরুণ, যুবকদের পর্যটন ব্যবসায় উৎসাহী এবং উদ্যোগী হতে সাহাযা করলে এলাকার যথাযথ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তা সহায়ক হবে বলে তাঁরা মনে করছেন।
ওই সমীক্ষাকে ভিত্তি করে রিপোর্টও তৈরি করছে বিশ্ববিদ্যালের ওই বিভাগ। পর্যটনকে কাজে লাগিয়ে ডুযার্সের বাসিন্দাদের আথ র্সামাজিক উন্নয়ন কী ভাবে ঘটতে পারে, সে ব্যাপারে ওই রিপোর্টে সুচিন্তিত পরামর্শ দেওয়া হবে। রিপোর্টটি রাজ্যের পর্যটন দফতরকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে দেওয়া হবে যাতে তা কার্যকর করতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সোমনাথ ঘোষ বলেন, ‘‘সংশ্লিষ্ট বিভাগের তরফে ওই কাজ চলছে। রিপোর্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। তবে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় আর্থ-সমাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন কাজের পরিকল্পনা ভাবনা চিন্তা রয়েছে।’’
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনব্যাপী শিক্ষণ এবং সম্প্রসারণ বিভাগের প্রধান এম ইয়াসিন বলেন, ‘‘বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে ডুয়ার্সে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন কী ভাবে ঘটানো যায়, সে ব্যাপারে ইতিমধ্যেই সমীক্ষা হয়েছে। বিস্তারিত রিপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এবং পর্যটন দফতরকে দেওয়া হবে।’’ সমীক্ষাটি উত্তর এবং দক্ষিণ ধূপঝোরার দু’টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় করা হলেও পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে ডুয়ার্সের এমন এলাকাগুলির চিত্র কম বেশি একই রকম বলে মনে করছেন সমীক্ষক দলের অধ্যাপকরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৩ মার্চ জীবনব্যাপী শিক্ষণ এবং সম্প্রসারণ বিভাগের ৪ জন অধ্যাপক, ৪ জন গবেষক এবং ৬৭ জন ছাত্রছাত্রী মিলে ওই সমীক্ষা চালায়। বেশ কিছু দিন আগে থেকে তা নিয়ে প্রস্তুতি চলে। সেই মতো মূর্তি নদীর কাছে উত্তর এবং দক্ষিণ ধূপঝোরা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় তাঁরা সমীক্ষা করেন। কাজের সুবিধার জন্য স্থানীয় ১০ জন ছাত্রছাত্রীকেও সামিল করা হয়। অন্তত সাড়ে তিনশো বাড়ি ঘুরে বাসিন্দাদের কাছ থেকে নানা প্রশ্নের জবাব সংগ্রহ করা হয়।
এই সমীক্ষায় বাসিন্দাদের জীবিকা, পর্যটকদের কাছে এলাকার আকর্ষণ কী, কোন সময় পর্যটনের পক্ষে ভাল, পর্যটনের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে কি না, কী ধরনের কাজে তারা যুক্ত হচ্ছেন, তাতে যে রোজগার হচ্ছে তাতে তাঁরা সন্তুষ্ট কি না, কাউকে জমি বিক্রি করেছেন কি না এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়। সমীক্ষার দায়িত্বে থাকা কো অর্ডিনেটর মনোতোষ বসু জানান, বাসিন্দাদের অধিকাংশই পর্যটন ব্যবসায় পাহারাদার, রিসর্টের কর্মী, রান্নার কাজে সহায়ক এ ধরনের জীবিকায় যুক্ত হচ্ছেন।
একাংশ পর্যটকদের বিনোদনের জন্য গান বাজনা করছেন। খুব কম অংশ এলাকায় গুমটি দোকান, চা মিষ্টির দোকানের মতো ব্যবসা করছেন। হাতে গোনা কয়েক জন পর্যটনের জন্য গাড়ি ভাড়া দিচ্ছে। রিসর্ট বা হোটেল মালিক স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে নেই বললেই চলে। অথচ এক শ্রেণির জমির কারবারিরা এই বাসিন্দাদের জমি বাইরের লোকদের বিক্রি করছে। তারা এখানে হোটেল, রিসর্ট করে কারবার করে ফুলে ফেঁপে উঠছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ, আর্থিক সাহায্য পেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই রিসর্ট গড়তে উৎসাহী রয়েছেন। তা ছাড়া সাহায্য পেলে ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলের ব্যবসাও অনেকে করতে পারবেন। এ ছাড়া, হোটেলগুলিতে স্থানীয় শাকসব্জি সরবরাহের মতো বিভিন্ন ধরনের কাজ বড় আকারে করার সুয়োগ রয়েছে।