সিনেমা হলের বক্স ভাঙা চলছে। —নিজস্ব চিত্র।
বালুরঘাটের বিতর্কিত সিনেমা হলে ফের হানা দিয়ে বক্স ভেঙে দিল পুলিশ। রবিবার সকালে সদর মহকুমা শাসক সন্দীপ দত্তের নেতৃত্বে বালুরঘাট থানার আইসি বিপুল বন্দ্যোপাধ্যায় বিরাট পুলিশ বাহিনী নিয়ে গিয়ে শহরের খাদিমপুর এলাকার ওই সিনেমা হলে হানা দেন। দোতালায় ১৬০টি সিটের তিনদিকে প্লাইউড দিয়ে ঘিরে তৈরি করা বক্স ভেঙে দেওয়া হয়। হলের ভিতর থেকে উদ্ধার করা হয় দুবস্তা আপত্তিকর সামগ্রী।
শনিবার ওই সিনেমা হলের দোতালার বক্সে হানা দিয়ে পুলিশ যুবক যুবতীদের আপত্তিকর অবস্থায় ধরে ফেলে। সে সময় হলের মালিক পিন্টু ওরফে ঘোলো দত্ত এবং তার স্ত্রী শম্পাদেবী পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান বলে অভিযোগ। এক পুলিশ ইন্সপেক্টরকে মারধোর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে পিন্টুবাবু ও শম্পাদেবী সহ মোট ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। মহকুমাশাসক সন্দীপ দত্ত বলেন, সিনেমা হলের মালিকের মদতে তিনটি শোতে ওই বক্স গুলিতে মধুচক্রের আসর চলত।
দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলাশাসক তাপস চৌধুরী বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর জেলা জুড়ে সমস্ত সিনেমা হলে অবৈধভাবে গড়ে তোলা বক্সের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। বালুরঘাটের ওই সিনেমা হলের মালিকের বিরুদ্ধে কড়া আইনগত ব্যবস্হা নেওয়া হয়েছে।
শনিবার পুলিশি অভিযানে ধৃত সিনেমা হলের মালিক সহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধির ১৮৬ (কর্তব্যরত পুলিশকে কাজে বাধা) ৩৫৩ (পুলিশের গায়ে হাত দেওয়া) ৩৩৩ (পুলিশকে মারধোর) ৫০৬, ৩৪ (সঙ্ঘবদ্ধভাবে হুমকি) এবং ইমমরাল ট্রাফিকিং অ্যাক্টের ধারায় মামলা রুজু করে তাঁদের এদিন বালুরঘাটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তোলা হয়। বক্সে আপত্তিকর অবস্থায় ধৃত দুই যুবক যুবতীর বিরুদ্ধে ট্রাফিকিং আইনের ধারায় মামলা দায়ের করে তাদেরও আদালতে হাজির করানো হয়। ভারপ্রাপ্ত সিজেএম কোর্টের বিচারক দেওয়ানি রাই সরকারি আইনজীবীর আবেদন মেনে সিনেমা হলের মালিক ঘোলো দত্ত এবং গেটম্যান লিটন সিংহকে তিনদিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। বাকি পাঁচ অভিযুক্তকে আগামী ৯ অক্টোবর পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
বালুরঘাট থানার আইসি বিপুল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওই সিনেমা হল মালিকের মদতে ৬ মাস আগে দোতালায় দুটি করে আসন নিয়ে তিনদিক প্লাই দিয়ে ঘিরে বক্স বানানো হয়েছিল। টিকিটের চড়া মূল্যের পাশাপাশি বেশি টাকা নিয়ে বক্সগুলিতে মধুচক্রের আসর চলছিল বলে অভিযোগ।’’
গোপন খবর পেয়ে শনিবার দুপুরে ওই বক্সে হানা দিয়ে সাদা পোশাকের পুলিশ কর্মীরা যুবক যুবতীদের আপত্তিকর অবস্থায় হাতেনাতে ধরে ফেলেন। বেশ কয়েকজন পালিয়ে যায়। এরপরই হল মালিক এবং তার স্ত্রী পুলিশি হানার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে নেমে বাধা দিতে থাকে বলে অভিযোগ।
পুলিশ হানায় এলাকা জুড়ে হইচই পড়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ ধরে পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে টাউন পুলিশ ইন্সপেক্টারের নেতৃত্বে হল মালিককে পাকড়াও করে বাইরে এনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের জিপে তুলতেই ভিড় থেকে জনতা হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। “পুলিশ জিন্দাবাদ” বলে জনতা শ্লোগান দিতে থাকে। পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রকাশ্যে এমন জয়ধ্বনি দেওয়ার মতো বিরল ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় লোকজন বলেন, ‘‘শাসক দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে ওঠাবসা এবং অর্থবলের কারণে ধৃত হল মালিক বেপরোয়া ও উদ্ধত আচরণ বাসিন্দাদের মুখ বুজে সহ্য করতে হত। দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে শহরের দীর্ঘকালের গৌরব ওই সিনেমা হলটির এমন পরিণতি দেখেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি বলে অভিযোগ।’’
এ দিন ওই সিনেমা হলের ভেতরের কুকীর্তি ফাঁস ও হল মালিক গ্রেফতারে খুশি ওই এলাকায় জমায়েত বাসিন্দারা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, দুপুর ১টা থেকে ম্যাটিনি শো শুরুর আগেই বেলা ১২টা থেকে শহরের বাইরের যুবক যুবতী থেকে কিশোর কিশোরীদের ওই সিনেমা হলে আনাগোনা শুরু হয়ে যেত। টাকার বিনিময়ে হলের ভিতর মেয়ে সরবরাহকারী চক্রও সক্রিয় হয়েছিল। বাংলা সিনেমা দেখতেও হলে ভিড় করতেন একাংশ বিএসএফ জওয়ান।