মজা নদী, কাঁটাতারহীন সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগ

বাসিন্দাদের তালিকা হচ্ছে ফাঁসিদেওয়ায়

বর্ষা ছাড়া সারা বছর খুব কম জল থাকে মহানন্দায়। ফলে, নানা জায়গায় চর ও ঝোপঝাড়। সুতোর মতো কয়েকটি ধারায় বইছে নদী। নদীর ওপারে বাংলাদেশ, এপারে ভারত। কিলোমিটারের পর কিলোমটার নেই কোনও কাঁটাতারের বেড়া। কিছু অংশ শুধু রয়েছে উঁচু নদী বাঁধ আর মাটিতে বিছানো কাঁটাতার।

Advertisement

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০১৪ ০২:৪৯
Share:

ফাঁসিদেওয়ার ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত। নদীবক্ষে পাথর, বালি তোলার কাজ চলছে। নিজস্ব চিত্র।

বর্ষা ছাড়া সারা বছর খুব কম জল থাকে মহানন্দায়। ফলে, নানা জায়গায় চর ও ঝোপঝাড়। সুতোর মতো কয়েকটি ধারায় বইছে নদী। নদীর ওপারে বাংলাদেশ, এপারে ভারত। কিলোমিটারের পর কিলোমটার নেই কোনও কাঁটাতারের বেড়া। কিছু অংশ শুধু রয়েছে উঁচু নদী বাঁধ আর মাটিতে বিছানো কাঁটাতার। নদীর মধ্যে থাকা সীমান্ত স্তম্ভের চারদিকের এলাকায় বালি, পাথরের স্তূপ। সাত সকাল থেকেই একদল লোক নদীবক্ষে নেমে কোদাল, বেলচা দিয়ে তা তুলে নিয়ে অবাধেই চলে যাচ্ছেন ‘ওপারে’। ওই দিকে বাঁধের ধারে দাঁড়িয়ে ট্রাক, ছোট গাড়িও। এক জায়গায় নয়, একাধিক জায়গায় দিনভর চলছে ওই কাজ।

Advertisement

আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ওই বাংলাদেশি নাগরিকদের স্তম্ভের এপারে আসার কথা না থাকলেও তা অবাধেই চলে বলে অভিযোগ। আবার কখনও কখনও সন্ধ্যার পর সন্দেহভাজনেরা এমনই খোলা সীমান্তের সুযোগে এপারে ঢোকে বলে একাধিকবার পুলিশ-প্রশাসনের কাছে খবরও পৌঁছেছে। গত কয়েক মাসে সন্দেহভাজন ধরা পড়া, শূন্যে গুলি করে তাড়ানো, গণপ্রহারের ঘটনাও ঘটেছে। সঙ্গে চলে গরু পাচারও। বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কান্ডের পরে শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়ার এমনই উন্মুক্ত বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ)।

বিএসেফের নর্থবেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারের আইজি সঞ্জীব কৃষ্ণ সুদ বলেন, “আমরা সতর্ক রয়েছি। সীমান্তে রাতে আলো, নাইট ভিশন ক্যামেরা, স্পিড বোটের ব্যবহার চলছে। বাংলাদেশের বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তবে নদীবক্ষে সীমান্ত স্তম্ভের এপারে নিয়মিত লোক ঢুকছে বলে যে অভিযোগ উঠছে, তা দেখা হচ্ছে।” তিনি জানান, সম্প্রতি ব্লকের মুড়িখাওয়া সীমান্ত দিয়ে কিছু সন্দেহভাজন এপারের ঢোকার চেষ্টা করেছিল। শূন্যে গুলি করা দলটিকে তাড়ানো হয়। এলাকাটি দার্জিলিং জেলা পুলিশের আওতায় রয়েছে। দার্জিলিঙের পুলিশ সুপার অখিলেশ চতুর্বেদী বলেন, “আমরা বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছি। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে।

Advertisement

পুলিশ ও বিএসএফ সূত্রের খবর, ফাঁসিদেওয়া ব্লকের লালদাস জোত থেকে মুড়িখাওয়া এলাকা অবধি প্রায় ২০ কিলোমিটার বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। গোটা এলাকায় চটহাট, ফাঁসিদেওয়া এবং জালাস নিজামতারা গ্রাম পঞ্চায়েতের আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে বিএসএফের লালদাস, বানেশ্বর, ফাঁসিদেওয়া, কালামগছ এবং মুড়িখাওয়াতে বিএসএফের সীমান্ত চৌকি রয়েছে। সীমান্তের লালদাস থেকে ধনিয়ামোড় অবধি কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। পরবর্তী বন্দরগছ অবধি প্রায় ১০ কিলোমিটার কোনও বেড়া নেই। মহানন্দা নদী এবং এপারের গ্রামের জমির সমস্যার জন্য কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যায়নি। এর সুযোগেই বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা বরবারই ফাঁসিদেওয়া সীমান্তে সক্রিয় বলে অভিযোগ।

প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ মুড়িখাওয়া এলাকায় একাধিক বাংলাদেশি দুষ্কৃতী ঢুকে গরু চুরি করে বলে অভিযোগ। মে মাসে ধনিয়ামোড় এলাকায় গাছে লুকিয়ে থাকা দুই সন্দেভাজন ধরা পড়ে। বাসিন্দারা তাঁদের গণপ্রহারও দেয়। এলাকায় পথ অবরোধও হয়। বছরের শুরুতেই একাধিক গরু চুরি ঘটনা ছাড়াও বিডিও অফিস সংলগ্ন এলাকার বাঁশঝাড় থেকে রাতে সন্দেহভাজন এক বাংলাদেশিকে ধরাও হয়। ফাঁসিদেওয়ায় চুরির ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে ধনিয়ামোড়, মুন্ডাবস্তি এবং বন্দরগছ এলাকার সমস্যা বেশি দেখা দেয়। ফাঁসিদেওয়ার বিডিও বীরুপাক্ষ মিত্র বলেন, “আমরা সব সময় পরিস্থিতির কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাই। দীপাবলির পরেই বিএসএফ, পুলিশের সঙ্গে বৈঠক হবে। সেখানে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা হবে।”

বিএসএফ বা পুলিশের অফিসারদের একাংশ জানান, ফাঁসিদেওয়া ব্লকের পূর্ব দিকের বাংলাদেশ সীমান্ত ছাড়াও পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে উত্তর দিনাজপুর ও বিহার। এতে মজা নদী পার হয়ে সহজেই এপারে এসে আশ্রয় নিয়ে বিহার বা উত্তর দিনাজপুরে ঢোকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে শীতের রাতে এই প্রবণতা বেশি থাকে।

তাই নতুন করে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও পরিবারের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। নতুন কোনও লোক এলাকায় দেখা গেলেই বাসিন্দাদের তা থানা বা সীমান্ত চৌকিতে জানাতে বলা হয়েছে। কোনও আত্মীয় এলেও তা করতে বলা হয়েছে। বিএসএফের নজরদারি ছাড়াও সীমান্তের গ্রাম, রাস্তায় একজন সাব ইন্সপেক্টর, একজন সশস্ত্র কনস্টেবল ছাড়াও কয়েকজন সিভিক ভলান্টিয়ারকে দুই দফায় নজরদারির কাজে নামানো হয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement