মাটিগাড়ায় মৃত্যুরহস্য

বর্ধন-নিবাসে আর থাকা হল না কারও

খুব একটা মিশুকে ছিলেন না বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী প্রদীপ বর্ধন। তাঁর স্ত্রী দীপ্তিদেবী এবং যুবক ছেলে প্রসেনজিৎ-ও বাড়ি থেকে খুব একটা বের হতেন না। যদিও, টিনের চালের পাকা বাড়ি ভেঙে বছর দুয়েক ধরে দোতলা বাড়ি তৈরি শুরু হওয়ার পরে সকলের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন। গত শনিবার-ই বাড়িতে শনিপুজোর আয়োজন করে পড়শিদের সকলকে প্রসাদ খেতে ডেকেছিলেন।

Advertisement

অনির্বাণ রায়

শেষ আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৩:৫০
Share:

উদ্ধার করা হচ্ছে প্রসেনজিৎ বর্ধনের দেহ। —নিজস্ব চিত্র।

খুব একটা মিশুকে ছিলেন না বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী প্রদীপ বর্ধন। তাঁর স্ত্রী দীপ্তিদেবী এবং যুবক ছেলে প্রসেনজিৎ-ও বাড়ি থেকে খুব একটা বের হতেন না। যদিও, টিনের চালের পাকা বাড়ি ভেঙে বছর দুয়েক ধরে দোতলা বাড়ি তৈরি শুরু হওয়ার পরে সকলের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন। গত শনিবার-ই বাড়িতে শনিপুজোর আয়োজন করে পড়শিদের সকলকে প্রসাদ খেতে ডেকেছিলেন। বাড়ির সদর দরজার উপরে তৈরি হয়েছে কংক্রিটের বড় সিংহমূর্তি, সঙ্গে একটি ময়ূরও। পাথরে খোদাই করে বাড়ির নাম লিখেছিলেন ‘বর্ধন-নিবাস’। প্রসাদ খেতে আসা পড়শিদের কাছে জনে জনে প্রদীপবাবু জানতে চেয়েছিলেন, সিংহটিকে কেমল লাগছে? ময়ূর ভাল হয়েছে তো? পড়শিদের বলেছিলেন, ‘‘রঙের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে দেখবেন, বাড়িটাকে কত সুন্দর দেখাবে।’’
এ দিন দুপুরে যখন দীপ্তিদেবীর রক্তমাখা দেহ বের করে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলা হল, তখন পড়শি মহিলাদের অনেককেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরে সাদা রঙের দোতলা ‘বর্ধন-নিবাস’ থেকে প্রথমে দীপ্তিদেবীর দেহ বের করে আনে পুলিশ। একতলার বসার ঘরে দীপ্তিদেবীর দেহের পাশ থেকেই ছেলে প্রসেনজিতের দেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রসেনজিতের হাতের কিছু দূরেই টিভির রিমোট পড়ে ছিল। প্রসেনজিতের দেহ-ও অ্যাম্বুল্যান্সে দীপ্তিদেবীর পাশেই শুইয়ে রাখা হয়। মা-ছেলের দেহ নিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সটি চলে যাওয়ার পরে, বর্ধন-নিবাসের সদর দরজার সামনে দাঁড়ায় আরও একটি অ্যাম্বুল্যান্স। দোতলা থেকে গৃহকর্তা অবসরপ্রাপ্ত বিদ্যুৎপর্ষদ কর্মী প্রদীপবাবুর দেহ নামিয়ে আনে পুলিশ। মা-বাবা-ছেলে, তিনজনের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের পুলিশ মর্গে।
বর্ধন পরিবারের তিন জনের খুনের খবর পেয়ে সকাল থেকেই লেনিনপুরে শোকের আবহ তৈরি হয়েছিল। এ দিন দুপুর একটা নাগাদ পরপর তিনটি দেহ বাড়ি থেকে বের হতে দেখার পরে, সেই শোক পরিণত হয় ক্ষোভে। শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা সহ অন্য পুলিশ কর্তাদের উপস্থিতিতেই, বাড়ির সামনের জটলা থেকে বারবার দ্রুত দোষীদের গ্রেফতারির দাবি শোনা গিয়েছে। পুলিশ থাকতে কী ভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়েও পুলিশ কর্তাদের শুনিয়ে চেঁচিয়ে প্রশ্ন করেছেন অনেকে। এলাকায় কোনও পুলিশি টহলই হয় না বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দাদের একাংশ। পরে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘‘দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’’

Advertisement

শিবমন্দিরের ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে কিলোমিটার দুয়েক দূরে লেনিনপুর। শিবমন্দির বাজার পেরিয়ে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার সাবস্টেশন লাগোয়া গলিতে ঢুকেই দোতলা বর্ধন-নিবাস। বাবা-মা এবং ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে মেয়ে রেশমিদেবীও বাড়িতে চলে এসেছিলেন। বছর সাতেক আগে তাঁর বিয়ে হয়। তিন জনের দেহ দেখে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন তিনি। তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান উল্টোদিকের বাড়ির বাসিন্দা মুক্তা কর্মকার। মুক্তাদেবীর কথায়, ‘‘গত শনিবারই বারের পুজোর প্রসাদ খেতে গিয়েছিলাম। কাকু (প্রদীপবাবু) বাড়ি তৈরি নিয়ে কত গল্প করলেন। বললেন খুব শীঘ্রই বাড়ি রঙের কাজ শেষ হবে।’’ এলাকার বাসিন্দা রাজা মজুমদার জানালেন, মাঝে মধ্যে দীপ্তিদেবী তাঁদের বাড়িতে গল্প করতে যেতেন। রাজাবাবু বলেন, ‘‘কাকু নিজেই বাড়ি তৈরির সব কিছু তদারকি করতেন। চড়া রোদে দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে কাজ দেখভাল করতেন। ভেবেছিলেন, কাজ শেষ হওয়ার পরে ছেলের বিয়ে দেবেন।’’ প্রদীপবাবুর বোন অনিমাদেবী শিলিগুড়ির রবীন্দ্রনগরের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘‘দাদা অবসরের পরে খুব শখ করে বাড়িটা তৈরি করছিলেন। খুব তৃপ্তি পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তুই সেই বাড়ির শেষ কিছুই তো দেখতে পেলেন না।’’ রাজাবাবু জানান, বর্ধন নিবাস নিয়ে প্রদীপবাবুর পরিকল্পনার কথা। ছেলের বিয়ের পরে সকলে দোতলায় থাকবেন বলে ঠিক করেছিলেন। এ দিন পুলিশ দোতলা থেকেই প্রদীপবাবুর দেহ উদ্ধার করেছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement