ভয় দেখিয়ে পরিচারিকাকে ১৪ বছর ধরে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার করা হল সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত দুই বাস্তুকারকে। বৃহস্পতিবার বাগডোগরার স্তালিননগরের ঘটনা। এ দিন ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাগডোগরা থানায় অভিযোগ করেন ওই তরুণী। মা এবং বউদিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি থানায় যান। সঙ্গে ছিলেন নকশালবাড়ি পঞ্চায়েত সমিতির নারী এবং শিশু জন কল্যাণ স্থায়ী সমিতির কর্মাধ্যক্ষ মণিকা ঘোষ এবং এলাকার বাসিন্দা মহিলা কংগ্রেসের সদস্যাদের একাংশ। শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনার জগ মোহন বলেন, “১৪ বছর ধরে এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত চলছে।”
পুলিশ জানায়, ধৃত দুই ব্যক্তির নাম দিলীপ দে এবং সুব্রত ঘোষ। সম্পর্কে সুব্রতবাবু দিলীপবাবুর দূর সম্পর্কের ভাই হন। দিলীপবাবুর বয়স ৭৩ বছর সুব্রতবাবুর ৬৮। স্তালিননগরে তাঁরা এক সঙ্গেই থাকেন। বেঙডুবি সেনা ছাউনিতেই তাঁরা কাজ করতেন। দুই জন ছাড়াও তাঁদের সঙ্গে থাকেন দিলীপবাবুর স্ত্রী লিনা দেবী। অভিযোগ, বেঙডুবি চা বাগানের বাসিন্দা দুঃস্থ পরিবারের ওই তরুণীকে ন’বছর বয়সে বাড়িতে কাজের জন্য নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা। বাড়িতে থাকা, কাজকর্ম করার পাশাপাশি তাঁকে পড়াশোনা শেখাবেন বলেও তরুণীর পরিবারকে জানিয়েছিলেন। এর পর দিলীপবাবুদের বাড়িতে কার্যত নজরবন্দি করে রাখা হত তরুণীকে। ১২ বছর বয়স হতেই ওই তরুণীকে তাঁরা দু’জনেই ধর্ষণ করতেন বলে অভিযোগ। রাতে অনেক সময় ঘুমোতে দেওয়া হত না। কথা না শুনলে মারধরও করতেন। বাসি রুটি, নষ্ট খাবার খাওয়ানো হত বলে অভিযোগ। শারীরিক সম্পর্ক করায় যাতে তরুণী গর্ভবতী না হয়ে পড়েন সে জন্য তাঁকে নিয়মিত জন্ম নিরোধক ট্যাবলেটও খাওয়ানো হত বলে তরুণী জানিয়েছেন। তিনি জানান, অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তরুণী পালাতেও চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দিলীপবাবুরা ধরে ফেলেন। বাড়ির দুটি গেটেই তালা দিয়ে রাখতেন সুব্রতবাবুরা। দুটি কুকুর ছেড়ে রাখা হত। তরুণীর পায়ে ঘুঙুর পড়িয়ে রাখা হত। যাতে পালাতে গেলে টের পান ওই বাড়ির লোকেরা।
অভিযুক্ত দিলীপ দে এবং সুব্রত ঘোষ জানান, অফিসের এক ব্যক্তি তরুণীর পরিবারের অভাবের কথা বলে বাড়িতে কাজের জন্য তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা পড়াশোনা শেখাতে চাইলেও তরুণী শিখতে চায়নি। তাঁরা বলেন, “তরুণী যে অভিযোগ তুলছে তা ঠিক নয়। আমাদের ফাঁসানো হচ্ছে।”
বাগডোগরা থানায় ওই তরুণী জানান, তাঁর উপর শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচারের কথা তিনি দিলীপবাবুর স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। তবে তিনি সে কথা কানে না তুলে স্বামী এবং সুব্রতবাবুকেই সাহায্য করতেন। প্রতিদিনই ওই দুই ব্যক্তি তাঁকে ধর্ষণ করত বলে অভিযোগ। মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়লে একটি নার্সিংহোমে তাঁকে চিকিৎসা করাতেও হয়। দিলীপবাবুরাই সেই ব্যবস্থা করেন। বাড়ির লোকদের কিছু জানাননি।
সমস্যার কথা বাড়ির লোকদের জানাননি কেন?
তরুণী জানান, বাড়িতে তাঁকে যেতে দেওয়া হত না। মা বা পরিবারের কেউ দেখা করতে এলে সুব্রতবাবু এবং দিলীপবাবুর উপস্থিতিতে তাঁরা কথা বলতেন। তাতে ওঁদের বিরুদ্ধে কিছু বলা যেত না। পরিচারিকার কাজ করলেও তাঁকে কোনও টাকা দেওয়া হত না। পরিবারের লোকেরা জানায়, সম্প্রতি শরীর প্রচন্ড খারাপ হয়ে পড়ায় কাজ করতে পারছিলেন না ওই তরুণী। দিলীপবাবুরা পরিবারকে খবর দেন মেয়ে পাগল হয়ে গিয়েছে। তাঁরা যেন বাড়ি এসে নিয়ে যান। গত ১২ মার্চ তরুণীর দিদি ও বউদি গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসেন। তরুণী কারও সঙ্গে কথা বলছে না দেখে বাড়ির লোকের সন্দেহ হয়। এর পর কয়েকদিন ধরে ধীরে সুস্থে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁরা সব কিছু জানতে পারেন।
তরুণীর মা জানান, তাঁর তিন মেয়ে এক ছেলে। তিনি চা বাগানে শ্রমিকের কাজ করেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারে আর্থিক সমস্যা বেড়ে যায়। ছোট মেয়ে দিলীপবাবুদের বাড়িতে থাকলে ভাল খেয়ে-পড়ে মানুষ হতে পারবে ভেবে সেখানে পাঠান। তিনি বলেন, “আমরা খবর নিলে দিলীপবাবু, সুব্রতবাবুরা বলতেন মেয়ে না কি দেখা করতে চায় না। এখানে ভাল রয়েছে। আমরা মানুষ করতে পারব না। তাই দেখা করে লাভ কী। আবার কখনও দেখা করতে গেলে ওরা সামনে বসে থাকতেন। কিন্তু এত বড় ক্ষতি ওরা করবেন ভাবতে পারিনি।” নকশালবাড়ি পঞ্চায়েত সমিতির কমার্ধ্যক্ষ মণিকা দেবী জানান, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হওয়া উচিত।