মিঠুন চক্রবর্তী কে দেখতে কোচবিহারের রাসমেলা ময়দানে উপচে পড়ে ভিড়। ছবি: হিমাংশুরঞ্জন দেব।
তৃণমূল সাসংদ তথা অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়ের সভা থেকে ফেরার সময় ভিড়ের চাপে অসুস্থ হয়ে এক তৃণমূল সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাতে কোচবিহার জেলা হাসপাতালে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতের নাম কার্তিক রায় (৪৮)। তাঁর বাড়ি কোচবিহার ২ ব্লকের মরিচবাড়ি এলাকায়। পেশায় কৃষক ওই ব্যক্তি এলাকার অন্য সমর্থকদের সঙ্গে রাসমেলার মাঠের সভায় আসেন। রাতে সভা সেরে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় ভিড়ে চাপে মাঠ লাগোয়া রাস্তাতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, “ওই ব্যক্তি গরমে ভিড়ের জেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন বলে চিকিৎসকরা জানান।” সভা শেষে ভিড়ের জেরে কোচবিহার শহর প্রায় এক ঘন্টা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঠাসাঠাসিতে রীতিমতো নাজেহাল হন বাসিন্দারা। এদিনের নির্বাচনী জনসভায় মিঠুনের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়ও ছিলেন।
এর আগে প্রায় সাত ঘন্টা অপেক্ষার পরেও ভিড়ের জেরে তারকা সাংসদকে ঠিকঠাক দেখতে না পেয়ে মঞ্চ লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়ার অভিযোগ উঠেছে একদল উত্তেজিত তৃণমূল কর্মী সমর্থকের বিরুদ্ধে। নির্ধারিত সময়ের ৫ ঘন্টার পর রাত সাড়ে ৭টা নাগাদ রাসমেলা ময়দানের সভাস্থলে পৌঁছান মিঠুন চক্রবর্তী ও মুকুল রায়। অভিনেতা সাংসদ মঞ্চে উঠতেই একদল কর্মী সমর্থক ভিড় ঠেলে মঞ্চে উঠতে যান। পুলিশকর্মীরা কোনওক্রমে ভিড় আটকান। এনিয়ে ক্ষোভের জেরেই একদল কর্মীসমর্থক মঞ্চ লক্ষ্য করে পাথর ও জলের বোতল ছুঁড়তে থাকেন। পরিস্থিতির জেরে মিঠুন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে শুরু করলে জনতা শান্ত হয়। মিনিট দশেকের বক্তব্যে তৃণমূল সাংসদ মিঠুন চক্রবর্তী সিনেমার ডায়লগ বলে জনতার মন জয়ের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “নাম তুফান, বছরে এক আধবার আসে। যখন আসে প্রলয় ঘটে, যখন যায় ভগবান শয়তান তার অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ায়। প্রলয় আসছে। বামেদের একাধিকবার সুযোগ দিয়েছেন। এ বার তৃণমূলকে সুযোগ দিন। মমতাদি পশ্চিমবঙ্গকে ভারতবর্ষের শীর্ষে নিয়ে যাবে, এটা আমার বিশ্বাস। তৃণমূলকে জয়ী করুন। কোচবিহারের জন্য রেনুকা সিংহ আওয়াজ তুলবেন লোকসভায়, আমি তুলব রাজ্যসভায়।” সেই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “উন্নয়ন না হলে আর আপনাদের কাছে ভোট চাইতে আসব না।” তৃণমূল নেতা মুকুলবাবু বাম, কংগ্রেস, বিজেপির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “কোনও দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেনা, তৃণমূল কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্নায়ক শক্তি হয়ে উঠবে।” এর আগে এ দিন ফালাকাটায় মিঠুন চক্রবর্তীকে দেখতে টাউন ক্লাবের মাঠে ভিড় উপচে পড়ে। জনসভা শেষ হওয়ার পর টানা এক ঘণ্টা যানজটে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে মাঠ লাগোয়া ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক। দোকানপাট বন্ধ করেও মাঠে যান এলাকার ব্যবসায়ীরা। কার্যত বন্ধের চেহারা নেয় শহর। দুপুর তিনটায় সভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয় পাঁচটা নাগাদ। মিঠুনের সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ও। মিঠুন মঞ্চে উঠতেই বাঁশের ব্যারিকেড ভেঙে জনতা মঞ্চের কাছে ছুটে আসে। অভিনেতা তথা সাংসদ বলেন, “আপনারা নিজেদের ভোট নষ্ট না করে তৃণমূল প্রার্থীকে ভোট দিন।”
সভাতেও উচ্ছ্বসিত ছিলেন কার্তিকবাবু
নিজস্ব সংবাদদাতা • কোচবিহার
মিঠুন চক্রবর্তীর সভায় যাবেন বলে সকাল দশটাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কার্তিক রায়। কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে গাড়িতে চেপে বেলা একটায় রাসমেলা ময়দানের সভাস্থলে পৌঁছোন। পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মাঠের মধ্যে বসে থাকেন তিনি। মিঠুন যখন সভাস্থলে পৌঁছোন, তখনও প্রিয় অভিনেতাকে দেখে উচ্ছ্বাসও করতে দেখা যায় কার্তিকবাবুকে। তার মিনিট কুড়ি বাদেই বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সহযাত্রীরা তাঁকে জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। সভা শেষে আর বাড়ি ফেরা হল না তাঁর। কোচবিহারের কোতোয়ালি থানার মরিচবাড়ির কট্টর তৃণমূল কর্মী বলে পরিচিত কার্তিক রায়ের (৪৩) সঙ্গে যে তৃণমূল কর্মীরা সভায় এসেছিলেন, কার্তিকবাবুর দেহ আগলে হাসপাতালেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। ঘটনার কথা শুনে মরিচবাড়ি গ্রামও স্ত্রী ও মেয়ে ওই ঘটনার কথা শুনে বারবার সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলছেন। কার্তিকবাবুর আত্মীয় তার সঙ্গেই সভায় আসা রামপ্রসাদ রায় বলেন, “কোথা থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। সভা শেষে গাড়ি ধরব বলে একসঙ্গেই সবাই হাঁটছিলাম। কার্তিকের হাঁটার গতি একটু বেশি ছিল, রাস্তার মধ্যেই হঠাৎ সে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, আর বাঁচানো গেল না। চিকিৎসকরা ধারণ করছেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কার্তিকবাবুর মৃত্যু হয়েছে।” তৃণমূলের জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, “কার্তিক আমাদের সক্রিয় কর্মী। তিনি যখন সভায় আসেন তখন সুস্থ সবলই ছিলেন। সভা শেষে বাড়ি ফেরার পথে অসুস্থ হন অনেক চেষ্টা করেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি। আমরা মর্মাহত তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করব।”
মরিচবাড়ি গ্রামে ভিটেমাটি নিয়ে দেড় বিঘে জমিতে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সংসার। কার্তিকবাবুর ওই জমিতে সামান্য কৃষিকাজের সঙ্গে দিনমজুরি করে সংসার চালান। কার্তিকবাবুর স্ত্রী বিনোদিনী দেবীও দিনমজুরি করেন। তার একমাত্র মেয়ে ন্টি বাণেশ্বর খাবসা হাইস্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী।