রাস্তা বাড়ছে না। অথচ যানবাহন বেড়েই চলছে শিলিগুড়িতে। হু হু করে খুলছে নতুন দোকানপাট, শপিং মল। আজব ব্যাপার হল, বেশির ভাগ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ফি বছর শহরের ইতিউতি খুলছে নানা সরকারি-বেসরকারি ব্যাঙ্কের একাধিক শাখাও। সেখানেও গ্রাহকদের জন্য পার্কিংয়ের কোনও পরিকাঠামোর কথাই ভাবা হয় না। ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই যানজটে থমকে চরম ভোগান্তি হচ্ছে নিত্যাযাত্রীদের। শহরবাসীরাও রাস্তায় বেরোলে গন্তব্যে কখন পৌঁছবেন তা নিয়ে হিসেব কষতে গিয়ে অনেকে খেই হারিয়ে ফেলেন। সেই কারণেই মেট্রো রেলের দাবিতে সরব হয়েছে হবু মহানগরী শিলিগুড়ি।
বাগডোগরা ব্যবসায়ী সমিতির কর্তা থেকে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির অধ্যাপক, শিক্ষক, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থীরাও সেই দাবিতে সামিল হয়েছেন। নিত্যযাত্রীরা তো এনজেপি থেকে বাগডোগরা পর্যন্ত মেট্রো চালুর দাবিতে রেল বোর্ডের কাছে দরবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি রুটের নিত্যযাত্রী তথা এক ব্যাঙ্ক কর্তা গৌতম গুহরায় বলেন, ‘‘শিলিগুড়ির রাস্তাঘাটের যা অবস্থা তাতে চলাফেরা করা দায়। সেখানে মেট্রো রেলের কথা ভাবার সময় এসেছে।’’ তাঁর যুক্তি, ‘‘ইদানীং তো ছোট ছোট শহরে মেট্রো রেল চালুর কথাবার্তা হচ্ছে।’’
যানজটে যে শুধু সাধারণ মানুষই নাকাল হচ্ছেন, তাই নয়। খোদ শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মাও মাঝেমধ্যে জটে আটকে পড়ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘শহরে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা ঠিকঠাক নেই। যানবাহনের তুলনায় রাস্তা বাড়ছে না। তাই ঘিঞ্জি হয়ে যাচ্ছে রাস্তা।’’ তাঁর দাবি, এরই মধ্যে ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক রাখছে।
কতটা স্বাভাবিক থাকছে, তা একঝলকে দেখে নেওয়া যাক। এনজেপি স্টেশনে নেমে নিত্যযাত্রী সুকন্যা রায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। তিনি স্টেশন থেকে অটোয় উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছতে প্রায় ২ ঘণ্টা লেগে যায়। অথচ দূরত্ব বড় জোর ১৪ কিলোমিটার। কোর্ট মোড় থেকে অটোয় উঠলে জংশনে পৌঁছতে লেগে যায় ২০-২৫ মিনিট। আবার কখনও শিলিগুড়ির হাসমি চক থেকে প্রায় ৭ কিমি দূরের মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছতে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়।
এই যন্ত্রণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে অটো, টোটো এবং রিকশা। শহরে আইনি-বেআইনি মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার রিকশা চলাচল করে। রিকশাকে এড়াতে পারলেও টোটো, অটোকে পেরিয়ে যাবেন সাধ্য কি! শিলিগুড়ি শহরে অনেক সময়ে দেখা যায়, খোদ মন্ত্রী, মেয়রের গাড়িও রিকশার পেছনে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বা এদের জাঁতাকলে পড়ে জেরবার হচ্ছে দমকল, অ্যাম্বুল্যান্সও। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক। তাই মেট্রোর দাবিতে এক সুর কস্তুরি মিত্র, সুরভি সেন, পলাশ বর্মন, রেখা রায়, শ্রবণ তামাঙ্গের মতো স্নাতক স্তরের পড়ুয়াদের।
এত দিন সরকারি দস্তুর ছিল, মেট্রোর জন্য শহরের জনসংখ্যা ১০ লক্ষ হতে হবে। এখন তার থেকে কমে স্মার্ট সিটির তকমা পেয়েছে অনেক শহর। তারাও মেট্রো বা মনোরেলের সুযোগ পাচ্ছে। যা শুনে ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, নর্থ বেঙ্গল (ফোসিন)-এর সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাস বলেছেন, ‘‘শিলিগুড়ির জনসংখ্যা তো ৭ লক্ষ ছাড়াতে চলেছে। তা ছাড়া শিলিগুড়ির বিশেষ অবস্থানের কথা ভেবে এখনই মেট্রো পরিষেবার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া জরুরি।’’
ভূমিকম্প প্রবণ শিলিগুড়িতে ভূগর্ভস্থ রেল কতটা নিরাপদ সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কিন্তু, জাপানের মতো ভূমিকম্প প্রবণ দেশে মেট্রো রেল বহাল তবিয়তে চলার কথা উল্লেখ করেছেন অন্য পক্ষ। সেই সঙ্গে মেট্রোর রেল বসাতে যে বিপুল খরচ, তা আদৌ তোলা সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। রেলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়ির এরিয়া ম্যানেজার তারকনাথ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘শিলিগুড়িতে মেট্রোর ভাড়া একটু বেশি করলেই লাভজনক হবে। মনে রাখতে হবে, যে শহরে মাথা পিছু গড় আয় বেশি, সেখানে মেট্রো লাভজনক হতে পারে।’’