হিমূলের দুধ মিলল না পুজোর মরসুমেই

পুজোর মুখে সরবরাহকারীদের টাকা মেটাতে না পেরে ফের বন্ধ হয়ে গিয়েছে উত্তরবঙ্গ সর্ববৃহৎ দুধ প্যাকেটজাত সংস্থা হিমুলের দুধ সরবরাহ। ষষ্ঠীর আগের দিন অবধি, কোনওমতে একবেলা করে সরবরাহ চললেও ওইদিন থেকে পুরোপুরি বন্ধ হিমুলের দুধ।

Advertisement

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০১৫ ০২:১৩
Share:

পুজোর মুখে সরবরাহকারীদের টাকা মেটাতে না পেরে ফের বন্ধ হয়ে গিয়েছে উত্তরবঙ্গ সর্ববৃহৎ দুধ প্যাকেটজাত সংস্থা হিমুলের দুধ সরবরাহ। ষষ্ঠীর আগের দিন অবধি, কোনওমতে একবেলা করে সরবরাহ চললেও ওইদিন থেকে পুরোপুরি বন্ধ হিমুলের দুধ। আজ, সোমবার লক্ষ্মীপুজো। তার আগে গিয়েছে দুর্গাপুজোর বাজার। তাতে কোনও দিনই সংস্থার তরফে বাজারে দুধ আসেনি। সংস্থা সূত্রের খবর, চলতি মাসে সংস্থার কর্মীদের বেতন দেওয়ার পর দুধ সরবরাহকারীদের টাকা মেটানোর মত টাকার যোগান না থাকায় মূলত এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে দার্জিলিঙে সংস্থার দফতরে ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটল’ বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা থাকলেও আগাম ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুজোর ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকায় সেখান থেকেও টাকা মেটানো যায়নি। যদিও ওই টাকা দিয়ে বকেয়া মেটানো নিয়ে সংস্থার অন্দরেও নানা মত রয়েছে। এই অবস্থায় কবে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে হিমূলের কর্মীদের মধ্যেই অনিশ্চয়তা রয়েছে। উল্লেখ্য, বিহার এবং শিলিগুড়ির সমতল মিলিয়ে দুধের প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা বকেয়া রয়েছে হিমূলের।

Advertisement

হিমূলের চেয়ারম্যান তথা জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আর সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক (সিইও) তথা জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক ইউ স্বরূপ বলেছেন, ‘‘আপাতত দুধ বন্ধ রয়েছে। তহবিলের কিছু সমস্যা রয়েছে। তা ছাড়া ব্যাঙ্কও বন্ধ ছিল। আমরা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।’’

হিমূল সূত্রের খবর, গত ১৩ অক্টোবর দার্জিলিঙে সংস্থার সিইও-র সঙ্গে হিমূলের তিনটি শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা দেখা করেন। এমনিতে, প্রতি মাসের শেষে আগের মাসের বেতন হলেও এবার যাতে পুজোর মুখে বেতন দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করার জন্য সংগঠনগুলি সিইওকে অনুরোধ করেন। সেই মোতবেক ১৭ অক্টোবরের মধ্যে একেবারে সংস্থার ১০৫ জন অফিসার, কর্মীর বেতন বাবদ প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা মিটিয়ে দেওয়া হয়। যদিও সংস্থায় বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের আলাদা আলাদা দিনে বেতন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও পুজোর কথা ভেবে তা করা হয়নি। আবার কর্মীরা পুজো বাবদ ৭ হাজার টাকা করে ‘এক্সগ্র্যাসিয়া’ দেওয়ার দাবিও সিইও-র কাছে করেছিলেন। এরজন্য আরও ৯ লক্ষ টাকার প্রয়োজন ছিল। দার্জিলিং দফতরের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল থেকে তা দেওয়া হবে বলে প্রাথমিকভাবে ঠিক হলেও শেষ অবধি তা দেওয়া হয়নি।

Advertisement

সংস্থার কয়েকজন অফিসার জানান, দুধ বিক্রির টাকা থেকে সরবরাহকারীদের টাকা শোধ করে কিছু কিছু করে টাকা ব্যাঙ্কে রাখা হয়। তা থেকেই ধাপে ধাপে বেতন এবং অন্যান্য খরচ করা হয়। কিন্তু এবার পুজোর জন্য কর্মীদের কথা ভেবে একবারে সব টাকা দিতে গিয়েই তহবিল কার্যত ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। তাই বিহারের দুধের বিল ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া যায়নি। সেই সঙ্গে পুরানো সমতলের প্রায় ১৫ লক্ষ এবং বিহারের আরও ১০ লক্ষ বকেয়াও রয়েছে। লক্ষ্মীপুজোর পর কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে তা পরিস্কার নয়।

বর্তমানে বিহারের বেগুসরাই থেকেউ মূলত হিমূলে দুধ আসে। ৫ হাজার লিটারের দুটি ট্যাঙ্কার কয়েকদিন পরপর আসতে থাকে। এ ছাড়া পাহাড় থেকে ৫০০ লিটার এবং সমতলের বিধাননগর ও অধিকারি থেকে আরও ৫০০ লিটার দুধ আসে। সব মিলিয়ে দুইবেলা ৮-১০ হাজার লিটার দুধ প্যাকেটজাত হয়ে বাজারে যায়। পুজোর সময় সাধারণত চাহিদা বেশি থাকায় সরবরবাহ ১০ হাজারে ছুঁয়ে যায়। মিষ্টির ব্যবসায়ী, সাধারণ বাসিন্দারা জানান, বিজয় দশমী থেকে লক্ষ্মীপুজো এই সময় দুধের চাহিদা বাজারে বেশি থাকে। সেই সময় সরকারি দুধের সংস্থার দুধ বাজারে না থাকাটা যথেষ্ট দুভার্গ্যজনক। প্রশাসনিক আধিকারিকদের পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই এতে নজর দেওয়া উচিৎ ছিল। আসলে সরকারি স্তরের একাংশের উদাসীনতায় হিমূলের আজ এই অবস্থা হয়েছে।

Advertisement

গত সেপ্টেম্বর মাসেও গুঁড়ো দুধ সরবরাহকারীদের চেক, নথি তৈরি না থাকায় গত তিনদিন ধরে বাজারে হিমূলের দুধ আসেনি।

গত দুই মাস আগে বদলি হন সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক (সিইও)। নতুন সিইও ইউ স্বরুপ দায়িত্ব নেওয়ার পর নথিপত্র, সরকারি আদেশনামা ব্যাঙ্কে জমা না পড়ায় আর্থিক লেনদেন এক দফায় থমকে যায়। প্রায় এক মাসে দুধ সরবরাহকারীদের বকেয়া এসে দাঁড়িয় প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা। এরমধ্যে বিহারে দুধ সরবরাহের বকেয়া ছিল ২০ লক্ষ টাকার মত। তার পরে ধীরে ধীরে কিছুটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

লোকসভা ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগে থেকেই হিমূলের ওই অচলাবস্থা চলছিল। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দফায় হিমূল আর্থিক কারণে বন্ধও হয়ে যায়। কিন্তু ভোটের জন্য তা মিলবে না বুঝতে পেরে শেষে নিজেদের পশুখাদ্য কারাখানার তহবিল থেকে ওই টাকা তোলা হয়। এর আগে ১৯৯১ সালেও দুই মাস হিমূল বন্ধ ছিল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement