— প্রতীকী চিত্র।
‘আমার নিজের কোনও বাড়ি নেই / অথবা যা আছে, তাকে তিমির পেটের মধ্যে চলমান অন্ধকার মনে হয়’!
প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের এ কবিতা বার বার মনে পড়ে, খাস কলকাতার ঝকঝকে পাদপ্রদীপের নীচেই। শহরের বিখ্যাত খালধার, আদিগঙ্গার পাড়, অজস্র রেলবস্তি, ঘিঞ্জি কলোনি, কাশীপুর থেকে বিস্তীর্ণ গঙ্গাপাড়ের মানুষ জন এ কবিতা না-পড়লেও ঘরের মধ্যে তিমির পেটের সেই অন্ধকার খুব চেনে। হিন্দু, মুসলিম, বিহারি, বাঙালির জীবন ছোঁয়া যে আঁধার নীল-সাদা উত্তরণের গলিকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে।
গল্ফগ্রিনের নিমাই শীটের অভিজ্ঞতাও আলাদা কি? আদতে কাঁথির ভূমিপুত্র নিমাই এই ৭৩ বছরে ঝোড়ো বস্তির ঘর থেকে নিজের ফ্ল্যাটে উঠেছেন। ‘আমার বাড়ী’ আবাসনে, ৪০ ফ্ল্যাটের চার-পাঁচটি বাড়ি। কেএমডিএ-র এক কামরা ফ্ল্যাট। দুই ছেলে, দুই বৌমা, তিন জন নাতি-নাতনি এবং নিজের ‘বুড়ি’ বৌকে নিয়ে নিমাইয়ের সুবৃহৎ পরিবার। খুপরি ফ্ল্যাটে ঢুকতে কসরত করতে হয়েছে। তবে তাঁর ঘরে আলো-হাওয়া ঢুকলেও সল্টলেকে রাধারানি মণ্ডলের ঘরে দিনেও সোলার লাইট। পাশের বড় বাড়ি মাথা তোলার সময়ে মিস্ত্রিদের ধরে নিজেরা নিকাশি লাইনসুদ্ধ শৌচাগার বসিয়েছেন। জলের খোঁজে ঘরের পাশেই গোলাকার টায়ার বসানো কুয়োর সংস্থান। ১২ নম্বর ট্যাঙ্কির কাছে এফএফ ব্লকে ৩০-৪০ ঘর ঝুপড়িবাসী সরস্বতী পুজো, কালীপুজো, রান্নাপুজো, ইদে আনন্দে মাতেন। সল্টলেকের বাস্তুতন্ত্রে ই-রিকশা, টোটো চালক, গৃহপরিচারিকা থেকে সেক্টর ফাইভের অফিসে ক্যান্টিনকর্মী, সাফাইকর্মীর অভাব মেটান ঝুপড়িবাসীরাই।
খাতায়-কলমে সল্টলেকবাসী হিসেবে তাঁরা অবশ্য ‘অদৃশ্য’ প্রশাসনের চোখে। বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীর এক কথা, “সল্টলেক সুপরিকল্পিত উপনগরী। এখানে কোনও বস্তির অস্তিত্বই নেই।” সৌন্দর্যায়নের বান-ডাকা কলকাতার গায়ের তথাকথিত কুশ্রীতাকে ভোলাতে তৃণমূল সরকার পুরসভার বস্তি বিভাগটিকেই উত্তরণ পরিষেবা নাম দিয়েছে। আর সুপরিকল্পিত বিধাননগর জুড়ে ছড়ানো বা খালধারে ঘাঁটি গাড়া ঝুপড়িগুলিকে স্পর্ধিত ভাবে অস্বীকার করছে পুরপ্রশাসন।
২০১৭ সালে সল্টলেকে যুব বিশ্বকাপের সময়ে উচ্ছেদ হিড়িকে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল বস্তিবাসীদের। উচ্ছেদের পরেও পুরনো প্রেমের মতো ফিরে এসেছেন তাঁরা। এফই, এফএফ, ১৩, ১৪ নম্বর ট্যাঙ্ক, উইপ্রোর কাছের ঝুপড়ি সব ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে আবার চিহ্নিত করছে নগরোন্নয়ন দফতর। নোটিস লটকেছে। ভোটের আগে একটু জনবহুল ঝুপড়ি, এমনকি সল্টলেক, কেষ্টপুরের মাঝে খালধারের ঝুপড়িতে অবশ্য উচ্ছেদ নোটিস পড়েনি। ছাড়, হয়তো সামনে ভোট বলেই।
এফএফ ব্লকের ঝুপড়িতে দুই ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ থেকে দিনাজপুরে ‘মিনি পশ্চিমবঙ্গ’-এর ছায়া! বৃদ্ধা পূর্মিলা মিস্ত্রি বলেন, সেই কোন কালে সল্টলেক যখন উলু ঘাসে ছয়লাপ, তখন থেকে আছি! ঝুপড়ির লোকেরাই তো কত অফিস, বাড়ি গড়ল। পূর্মিলার বৌমা পুষ্প সাহা স্থানীয় ভোটার, লক্ষ্মীর ভান্ডার পান। সেক্টর ফাইভের বড় অফিসে ক্যান্টিন কর্মী মোজাম্মেল হক, আরজিনা বিবির মেয়ে মারুফা লবণহ্রদ বিদ্যাপীঠে ক্লাস সিক্স, বিকেলে ‘টিউশন’ নেয়। বারাসতে তৃণমূলের ‘রণ সঙ্কল্প সভা’ থেকে ঘুরে এসে ই-রিকশা চালক শ্রীমন্ত দাস বলেন, “আমরা সভায় যাই, আমরাই বেআইনি হই!”
পাঁচ নম্বর ট্যাঙ্কের কাছের ঝুপড়িবাসী ২৬ বছরের সুজয় সর্দার রিকশা চালান। মুক্ত বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক দিয়ে এগারো ক্লাসে পড়ছেন। তাঁর প্রশ্ন, “পশ্চিমবঙ্গ সরকার তো ভিন্ রাজ্যে বাঙালিদের জবরদখলকারী বাংলাদেশি বলার বিরোধিতা করছে। তা হলে আমরা কেন শুধু উচ্ছেদের নোটিস পাই?”
পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের এক কর্তা সেই ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের গীত গান। কলকাতায় বাগবাজারে, গার্ডেনরিচে ফ্ল্যাট ওঠার বড়াই করে পুরসভাও। কেউ কেউ বলেন, এই উত্তরণের মাধ্যমেও ঘুরিয়ে জাঁকিয়ে বসছে ‘ঠিকাদার-তন্ত্র’। ফ্ল্যাটে কারা ঠাঁই পাচ্ছেন? কে ফ্ল্যাটে যেতে চায়? কে চায় না? এই নিয়ে দাবি-পাল্টা দাবির চর্চা চলে শহুরে বাতাসে।
বস্তিবাসীদের জমির অধিকার নিয়ে ২০১৭ সালে তা-ও আইন হয়েছে ওড়িশায়। টালা সেতু নির্মাণের সময়ে উচ্ছেদ বাসিন্দাদের পুনর্বাসনে বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি হাই কোর্টে লড়েছিল। তাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ অনুযায়ী ভারতের দায়বদ্ধতা বা এ দেশের সংবিধানে সবার মর্যাদায় বাঁচার অধিকারের কথা স্মরণ করায় আদালত। কিন্তু আইনি অধিকার ছাড়া বস্তিবাসীরা নিছকই প্রকল্পের সুবিধাভোগী থেকে যান।
বাম আমল থেকে উচ্ছেদের ধারাবাহিকতা দেখে আসা রাধারানিরা সরকারি সদিচ্ছার দিকে তাকিয়ে। উত্তরণের পাকা বস্তি, ফ্ল্যাটেও শোনা যায়, দুর্নীতির জালে বন্দি রাজ্যে চাকরির জন্য হাহাকার। টালার ইন্দ্র বিশ্বাস রোডের টালির ঘরের বাসিন্দা, গৃহপরিচারিকা মহিলা বললেন, “স্থানীয় নেতা বলে গেলেন, তোরা তো এখানেই ভাল আছিস, পাকা ফ্ল্যাটে গেলে কিন্তু অন্য ধর্মের লোকেরাও থাকবে!” সল্টলেকের ঝুপড়িবাসী সুজয় শোনান, “এসআইআর-হাওয়ায় আমাদের বস্তির সামনে চক্কর কেটে এক টিভি চ্যানেল সে-দিন ‘এই দেখুন রোহিঙ্গারা’ বলে চলে গেল!”
ওঁরা জানেন, ছাদ, ভাতের বাঁচার লড়াই তীব্র হলে জাত, ধর্মের অঙ্কে ভাগ করাই পুরনো নিয়ম।
(শেষ)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে