কোটশিলার উকমা গ্রামে তদন্তে বিডিও। নিজস্ব চিত্র
এক হাজার টাকা ঋণ নিলে, জমা দিতে হবে একটি রেশন কার্ড। টাকা শোধ না দেওয়া পর্যন্ত রেশনের যাবতীয় জিনিস ঋণদাতা, অর্থাৎ, মহাজন পাবেন। এই শর্তে পুরুলিয়ার কোটশিলার উকমা গ্রামে কিছু মহাজন দীর্ঘদিন ধরে কারবার চালাচ্ছিলেন। অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণের সময় রেশন কার্ডের প্রয়োজন পড়লে, মহাজনেরা তা ফেরত না দেওয়ায় শোরগোল পড়ে।
শনিবার বিডিও (ঝালদা ২) অভিষেক চক্রবর্তী গ্রামে গিয়ে বেশ কিছু রেশন কার্ড উদ্ধার করেন। তিনি বলেন, ‘‘প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। রেশন কার্ড আটকে রাখা যাবে না। পুলিশকে দেখতে বলেছি।’’ পুলিশ জানিয়েছে, রেশন কার্ডগুলি উপভোক্তাদের ফেরানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহাজনদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা উচিত বলে মত পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতোর। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘তৃণমূলের আমলে এতই ‘উন্নয়ন’ হয়েছে যে, অভাবের তাড়নায় রেশন কার্ড পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়েছে।’’ তৃণমূল নেতৃত্ব সেই কথা মানেননি।
কয়েক বছর আগে ঝালদা ১ ব্লকের সারজুমাতু গ্রামে রেশন কার্ড বন্ধক রেখে মহাজনি প্রথা বন্ধ করেছিলেন তৎকালীন জেলাশাসক রাহুল মজুমদার। তবে জেলার অন্য এলাকায় যে তা রয়ে গিয়েছে, উকমার ঘটনা তারই প্রমাণ।
কালিন্দীপাড়ার বাসিন্দাদের সামান্য জমি থাকলেও দিনমজুরিই ভরসা। মহিলারা বাঁশের সরঞ্জাম তৈরি করেন। ভাদু কালিন্দীর দাবি, ‘‘অভাবে পড়ে বছর সাতেক আগে অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনার সাতটি রেশন কার্ড মহাজনের কাছে বন্ধক রেখে সাত হাজার টাকা নিই। টাকা দিতে পারিনি। তাই রেশন ডিলারের দোকানে আঙুলের ছাপ দিই। কিন্তু চাল, আটা সব মহাজনই নেন। অনুরোধ করলে, অল্পসল্প চাল দেন।’’ সন্ধ্যা কালিন্দী বলেন, ‘‘বছর তিনেক আগে স্বামীর মৃত্যুর পরে, মহাজনের কাছে ছ’টা রেশন কার্ড বন্ধক রেখে টাকা ধার করি। সেই থেকে কার্ডের মালপত্র মহাজনই পাচ্ছেন।’’ চঞ্চলা গড়াইত জানান, ঘর সারাতে বছর পাঁচেক আগে পাঁচটি রেশন কার্ড মহাজনকে দিয়ে হাজার পাঁচেক টাকা নেন। তাঁরও রেশনের সামগ্রী
মহাজনই নিচ্ছেন।
গ্রামবাসীর দাবি, এটাই এলাকার চল ধরে নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করেননি। তবে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের উপভোক্তারা এ বার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আবেদন করতে গিয়ে জানতে পারেন, রেশন কার্ড লাগবে। ঋণগ্রহীতা মহিলাদের একাংশের অভিযোগ, মহাজনের কাছে রেশন কার্ড দু’দিনের জন্য আনতে গেলে, তাঁদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি প্রশাসনের কানে যায়। শুক্রবার পুলিশ গিয়ে মহাজনদের থেকে কিছু রেশন কার্ড উদ্ধার করে। এ দিন বিডিও গ্রামে গেলে আরও কিছু কার্ড উদ্ধার হয়। অধিকাংশ মহাজনকেই পাওয়া যায়নি। তবে সুষেন মাহাতো নামে এক জন বলেন, ‘‘রেশন কার্ড রেখে অন্যায় করেছি। প্রশাসন বললে, এত দিনের রেশনের চাল-আটাও ফেরত দেব।’’
রেশন ডিলারদের সূত্রের জানা যায়, অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনায় পরিবারে তিন জন পর্যন্ত সদস্য থাকলে মাসে ১৫ কেজি চাল এবং ২০ প্যাকেট আটা মেলে। সদস্য তিনের বেশি হলে চতুর্থ বা তার বেশি সদস্য পিছু ১১ কেজি করে চাল পাওয়া যায়। বাজারে চালের দাম প্রায় কেজি প্রতি ২৫ টাকা। আটা প্রতি প্যাকেট প্রায় ১০ টাকা। সেই হিসাবে সাতটি কার্ড থাকলে, বছরে একটি পরিবার ১৭,৭০০ টাকার চাল এবং ২৪০০ টাকার আটা পায়। এত টাকার জিনিসপত্র উপভোক্তার বদলে মহাজনই নিচ্ছিলেন। ঘটনার বিন্দুবিসর্গ জানতেন না, দাবি ঝালদা ২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তৃণমূলের দীপক সিংহের। তিনি বলেন,
‘‘তদন্ত হোক।’’
রেশন ডিলার ঠাকুরদাস মিশ্রের দাবি, ‘‘আঙুলের ছাপ নিয়ে জিনিস দেওয়া হয়। পরে সে মাল কে, কাকে দিচ্ছেন, দেখার সুযোগ থাকে না।’’ তবে এই ঘটনার পরে গ্রামে প্রশাসনের তরফে মাইকে প্রচার হচ্ছে, রেশন কার্ড হস্তান্তর করা যাবে না।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে