পাত্রসায়রে ডুবে মৃত মাসি, দুই বোনঝি

মামারবাড়িতে গাজনে বেড়াতে এসে মাসিকে নিয়ে পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিল দুই বোনঝি। জলে ডুবে তিনজনেরই মৃত্যু হল। স্থানীয় বাসিন্দারা পুকুরে নেমে তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করলেও কাউকে বাঁচানো যায়নি। মঙ্গলবার সকালে পাত্রসায়র থানার বালসি গ্রামের ঘটনা। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদের নাম অঙ্কিতা ওরফে বৃষ্টি নায়েক (১৩), সোমা পাল (১৫) ও বৈশাখী দাস (১৮)। অঙ্কিতার বাড়ি পাত্রসায়রের ডান্না গ্রামে। সোমার বাড়ি বর্ধমান সদর থানার ছোট নীলপুরে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাত

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৫ ০১:০৪
Share:

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অঙ্কিতার মা। ছবি: দেবব্রত দাস।

মামারবাড়িতে গাজনে বেড়াতে এসে মাসিকে নিয়ে পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিল দুই বোনঝি। জলে ডুবে তিনজনেরই মৃত্যু হল।

Advertisement

স্থানীয় বাসিন্দারা পুকুরে নেমে তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করলেও কাউকে বাঁচানো যায়নি। মঙ্গলবার সকালে পাত্রসায়র থানার বালসি গ্রামের ঘটনা।

পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদের নাম অঙ্কিতা ওরফে বৃষ্টি নায়েক (১৩), সোমা পাল (১৫) ও বৈশাখী দাস (১৮)। অঙ্কিতার বাড়ি পাত্রসায়রের ডান্না গ্রামে। সোমার বাড়ি বর্ধমান সদর থানার ছোট নীলপুরে। বৈশাখীর আদি বাড়ি বিষ্ণুপুরে হলেও তিনি থাকতেন সোনামুখীতে মামার বাড়িতে। গাজনের দিনে এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকায়।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রের খবর, গাজন উপলক্ষে সোমবার বালসি গ্রামের বাল্লেশ্বরতলার বাসিন্দা যোগেশ্বর মহন্তের বাড়িতে এসেছিল তাঁর দুই ভাগ্নি অঙ্কিতা ও সোমা। তাঁর বাড়িতে এসেছিল মাসতুতো বোন বৈশাখীও। মহন্ত পরিবার সূত্রের খবর, এ দিন সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ সম্পর্কিত মাসি বৈশাখীর সঙ্গে স্নান করতে বাড়ির কাছেই বাগীশপুকুরে গিয়েছিল অঙ্কিতা ও সোমা। তিনজনের কেউই সাঁতার জানত না। স্নান করতে নেমে ওই তিনজনের মধ্যে কোনও একজন তলিয়ে যায়। অন্য দু’জন তাকে ধরতে গেলে তারাও তলিয়ে যায়।

সেই সময় পুকুরের অন্য পাড়ে এক বধূর নজরে পড়ে ঘটনাটি। তিনিই স্থানীয় কয়েকজন লোকজন ও দোকানদারকে জানান। সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা পুকুরে নেমে উদ্ধার কাজ শুরু করে দেন।

খবর পেয়ে এলাকার বাসিন্দা তথা পাত্রসায়র পঞ্চায়েত সমিতির বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ কাশীনাথ অধিকারী, বালসি ২ পঞ্চায়েত প্রধান বুদ্ধদেব পাল ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারই মধ্যে জলে একটি দেহ ভাসতে দেখা যায়। এরপর গ্রামবাসীই পুকুর থেকে আরও দু’জনের দেহ উদ্ধার করেন। উদ্ধারের পর তিনজনকেই তড়িঘড়ি পাত্রসায়র ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাদের দেহ পরীক্ষা করে মৃত বলে জানান।

এ দিন দুপুর ১২টা নাগাদ পাত্রসায়র ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, মৃতের পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়েরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বরে ভিড় করেছেন এলাকার বহু মানুষ। জলে ডুবে মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছুটে আসেন অঙ্কিতার বাবা, মা, কাকা-সহ তার বাড়ির লোকজন। ডান্না গ্রামের বাসিন্দা অসীম নায়েকের দুই মেয়ের মধ্যে বড় ছিল অঙ্কিতা। পাত্রসায়র বামিরা গুরুদাস বিদ্যায়তনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত সে। তার বাবা অসীমবাবু কোলিয়ারিতে চাকরি করেন। এ দিন সকালেই তিনি বাড়ি ফেরেন। তারপরেই এই খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন অসীমবাবু ও তাঁর স্ত্রী ববিদেবী।

দেড় বছরের ছোট মেয়েকে কোলে জড়িয়ে ধরে ববিদেবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “সোমবার সকালে মামারবাড়ি যাওয়ার জন্য কাঁদছিল। বললাম তোর বাবা আসুক, তার পর যাবি। কিন্তু ও বালসি যাওয়ার জন্য জেদাজেদি শুরু করায় যেতে দিই। কিন্তু এমন হবে কে জানত।”

দুই ভাগ্নি ও এক মাসতুতো বোনকে হারিয়ে কার্যত বাকরুদ্ধ অবস্থা যোগেশ্বরবাবুর। এতবড় আঘাতে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত যোগেশ্বরবাবু বললেন, “ওরা একসঙ্গে গাজন দেখতে এসেছিল। একসঙ্গেই স্নান করতে গিয়েছিল পুকুরে। সেখানে কী ভাবে তিনজনই একসঙ্গে ডুবল ভেবে পাচ্ছি না। জীবনে এতবড় আঘাত কোনওদিন পাইনি।” বৈশাখীর অবশ্য বাবা-মা কেউই নেই। ছোটবেলায় বাবাকে, পরে মাকে হারানো বৈশাখী থাকত তার মামারবাড়ি সোনামুখীতে। প্রতিবছরের মত এ বছরও বালসিতে মাসতুতো দাদার বাড়িতে গাজন দেখতে এসেছিল।

যোগেশ্বরবাবুর মেজদিদি পূর্ণিমাদেবীর দুই ছেলে রাজেশ ও রতন এবং এক মেয়ে সোমা। বর্ধমানের ছোটনীলপুরের বাসিন্দা সোমা এ বার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। বালসি -২ পঞ্চায়েত প্রধান বুদ্ধদেব পাল বলেন, “প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে ওই তিনজনের মধ্যে কোনও একজন স্নান করতে গিয়ে পা হড়কে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই সময় অন্য দু’জন তাকে ধরতে গিয়ে তারাও তলিয়ে যায়। সাঁতার না জানায় নিমেষের মধ্যে জলে ডুবে যায় তারা।”

উদ্ধার কাজে হাত লাগানো গ্রামবাসীদের তরফে দীপঙ্কর গোস্বামী, লক্ষ্মী ভট্টাচার্য, পিঙ্কু আচার্য এ দিন স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বরে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করছিলেন, “খবর পেয়ে আমরা পুকুরে নেমে ওদের অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করলাম। কিন্তু ভাবতে পারিনি ওদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব না।’’

গাজনের মধ্যে জলে ডুবে একই সঙ্গে তিনজনের মৃত্যুতে শোকে মূহ্যমান গোটা বালসি। মঙ্গলবার দিনভর স্বজনহারার আর্তনাদ শোনা গিয়েছে বালসির বাল্লেশ্বরতলার মহন্ত বাড়িতে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement