বুধবার ময়ূরাক্ষী নদীর চরে পুলিশ-প্রশাসনের উপস্থিতিতে তোলা হচ্ছে দেহ। ছবি: অনির্বাণ সেন
নদীতে গিয়েছিলেন গাঁয়ের এক মহিলা। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে বালির ভিতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে রয়েছে। ভয়ে চিৎকার করে ওঠেন তিনি। কাছেই ছিলেন একজন। মহিলার চিৎকার শুনে তিনি ছুটে আসেন। দের সন্দেহ হয়, ক’দিন আগে গ্রাম থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ওই তরুণীর হাত নয়তো? তরুণীর বাড়ির লোকেরাও ছুটে আসেন। কিন্তু হাতটি এতটাই বিকৃত হয়ে যায়, বাড়ির লোকেরাও সনাক্ত করতে পারেননি। শেষে ছুটে আসে পুলিশ। উদ্ধার হয় দেহ। অপহরণ করে খুনের লিখিত অভিযোগ দায়ের হলেও পরিবার ও গ্রামবাসীদের সন্দেহ মেয়েটিকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে।
পাশের বাড়িতে টিভি সিরিয়াল দেখতে বেরিয়ে সাঁইথিয়া এলাকার বছর একুশের ওই তরুণী আর বাড়ি ফেরেননি। এর সাত দিন পর বুধবার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ময়ূরাক্ষী নদীর চর থেকে উদ্ধার হল তাঁর পচাগলা নগ্ন দেহ। ওই তরুণীর পরিবারের দাবি, গত বুধবার সন্ধ্যায় পাশের বাড়িতে টিভি দেখবে বলে তিনি বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ে তিনি না ফেরায় বাড়ির লোকেরা খোঁজ শুরু করেন। গ্রামে পরিচিতদের বাড়ি থেকে কাছাকাছি থাকা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও খোঁজ শুরু হয়। কিন্তু সেই রাত তো বটেই, পরের দিনও তাঁর হদিস মেলেনি।
শেষে গত বৃহস্পতিবার সাঁইথিয়া থানায় নিখোঁজের ডায়েরি করেন পরিবারের লোকেরা। তারপর এ দিন নদীর বালি থেকে বিডিও ও থানার ওসির উপস্থিতিতে মেয়েটির পচাগলা নগ্ন দেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের পরিবারের ধারণা, ধর্ষণ করার পরে শ্বাসরোধ করে তাঁকে খুন করে বালিতে পুঁতে দেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, তরুণীর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই গ্রামেরই কান্তিরাম বাগদিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশের লাভপুর থানা এলাকার ভালকুটি গ্রামের বাসিন্দা রামপ্রসাদ বাগদি নামে আর এক অভিযুক্তের বিরুদ্ধেও তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই তরুণী ও তাঁর মা মাঝে মধ্যেই পড়শিদের বাড়িতে টিভি সিরিয়াল দেখতে যেতেন। তরুণীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাঁরা চার বোন। তার মধ্যে নিহত তরুণী ছিলেন ছোট। গত বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ পাশের বাড়িতে তিনি একা সিরিয়াল দেখতে যান। কিন্তু ওই বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য সে দিন টিভি চালানো হয়নি। তখন পাশের কান্তিরাম বাগদির বাড়িতে ওই তরুণী টিভি দেখতে যান বলে অভিযোগ। পরে ওই তরুণীর মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্য এক পড়শির বাড়িতে টিভি দেখতে যান।
এ দিন তরুণীর কাকা দাবি করেন, ‘‘বৌদি রাত্রি সাড়ে ৮টা নাগাদ তিনি বাড়ি ফিরে দেখেন তাঁর মেয়ে ফেরেনি। তারপর বৌদি পড়শিদের বাড়িতে খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারে মেয়ে কান্তিরামের বাড়িতে গিয়েছিল। তাঁদের কাছে খোঁজ করতে গেলে পরিষ্কার ভাবে কিছু জানায়নি। আশপাশের এলাকাতেও আমরা খোঁজ শুরু করি। কিন্তু কেউই হদিস দিতে পারেনি।’’
এ দিন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সবাই শোকগ্রস্ত। তাঁরা অভিযোগ করেন, পেশায় দিন মজুর বছর পঁয়তাল্লিশের কান্তিরাম বিপত্নীক। তন্ত্র সাধনাতেও মেতেছিলেন তিনি। তার কাছে নিয়মিত যাতায়াত ছিল লাভপুর থানার ভালকুটি গ্রামের রামপ্রসাদ বাগদির। দু’জনকেই গ্রামবাসী সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাই ওই তরুণীর নিরুদ্দেশের সঙ্গে কান্তিরামের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীর প্রথম থেকেই ওদের উপরেই সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোনও প্রমাণ না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কিছু করা যায়নি। এ দিন বেলার দিকে দেহটি তরুণীর বলে একপ্রকার বুঝে যাওয়ার পরেই গ্রামবাসীদের একাংশ কান্তিরামের উপর চড়াও হন। তাকে অল্পবিস্তর মারধরও করা হয়। পুলিশ গিয়ে কান্তিরামকে বাসিন্দাদের হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পরে অভিযোগ পেয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
দুপুর আড়াইটা নাগাদ বিডিওর উপস্থিতিতে নদীর বালি থেকে দেহটি তোলা হয়। বিকৃত মুখ ও দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মেয়েটির মা, বাবা থেকে আত্মীয় স্বজনেরা। দেহের অর্ধেক অংশে পোশাক ছিল না। দেহের কিছু অংশে কাটা দাগও পাওয়া গিয়েছে। তা কোনও বন্যপ্রাণী কিংবা আততায়ীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির চিহ্ন কি না খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, দেহটি আজ বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্তের জন্য বর্ধমান পাঠানো হবে। তরুণীর কাকা বলেন, ‘‘আমাদের ধারনা ভাইঝি টিভি দেখতে গেলে কান্তিরাম ও রামপ্রসাদ বাগদি ওকে অপহরণ করে খুন করেছে। থানায় ওই দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।’’ পরে পুলিশ কান্তিরামকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তরুণীর মা ও বাবা কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। তবে মেয়ের খুনিদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই দাবিতে সরব গ্রামবাসী।