সরেজমিন: নদ পরিদর্শনে কমিটির প্রতিনিধিরা। ছবি: অভিজিৎ সিংহ
জেলায় দ্বারকেশ্বর নদের চরে ধর্মীয় সংগঠনের উৎসবকে কেন্দ্র করে বিতর্ক বেঁধেছিল কিছু দিন আগে। আগামী মঙ্গলবার বাঁকুড়ার সতীঘাটে যেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের কর্মিসভা করার কথা, সে জায়গাটিও গন্ধেশ্বরী নদীর চরের ‘উপরে’ বলে আপত্তি তুলল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ।
সংগঠনের বাঁকুড়া শাখার সম্পাদক জয়দেব চন্দ্র বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘নদীর চরে সভা করা অনুচিত। প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে কর্মসূচির স্থান পরিবর্তনের দাবি তুলেছি।’’ তবে বাঁকুড়ার জেলাশাসক উমাশঙ্কর এস বলছেন, ‘‘ব্যক্তিগত জমিতে মুখ্যমন্ত্রীর সভা হওয়ার কথা। নদীর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।’’ তৃণমূলের জেলা সভাপতি শুভাশিস বটব্যালের বক্তব্য, “কিছু দলীয় কর্মী হয়তো নদীর চরে বসবেন। তবে নদীর পরিবেশের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, সে দিকে আমাদের নজর থাকবে।” তাঁর আশ্বাস, অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরে, দ্রুত কর্মিসভায় ব্যবহৃত নদীর অংশ পরিষ্কার করে দেওয়া হবে।
জানুয়ারিতে দ্বারকেশ্বর নদের চরে একটি ধর্মীয় সংগঠন উৎসবের আয়োজন করেছিল। সে সময়ে আন্দোলনে নামে বাঁকুড়ার বেশ কয়েকটি পরিবেশপ্রেমী সংগঠন। ওই অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি তুলে জাতীয় পরিবেশ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের বাঁকুড়া শাখা। ধর্মীয় অনুষ্ঠান অবশ্য হয়েছে ঘোষিত জায়গাতেই। ওই ধর্মীয় সংগঠনের কর্তাদের দাবি, প্রশাসনের দেওয়া শর্ত মেনেই তাঁরা অনুষ্ঠান করেছেন। তবে অনুষ্ঠানের জন্য দারকেশ্বর নদের পরিবেশের কোনও ক্ষতি হয়েছে কি না, তা জানতে তিন জনের একটি কমিটি গড়ে দিয়েছে জাতীয় পরিবেশ আদালত। বৃহস্পতিবার কমিটির তিন সদস্য— রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র, জাতীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের বরিষ্ঠ সদস্য রীতা দাস ও বাঁকুড়ার জেলাশাসক উমাশঙ্কর এস উৎসব পরবর্তী দ্বারকেশ্বর নদের অবস্থা খতিয়ে দেখেন। দ্বারকেশ্বর প্রসঙ্গে কল্যাণবাবু বলেন, ‘‘জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশে এসেছি। যা বলার, তা রিপোর্ট আকারে আদালতকেই জানাব।’’
আগামী সোমবার জেলায় আসার কথা মুখ্যমন্ত্রীর। মঙ্গলবার সতীঘাটের কাছে কর্মিসভায় ৫০ হাজার তৃণমূল কর্মী যোগ দিতে পারেন বলে দল সূত্রের দাবি। ওই সভা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি কল্যাণবাবু। তবে নদী-বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, নদীর চরে সভা বা অনুষ্ঠান করতে হলে মূলত তিন ধরনের ক্ষতি হতে পারে। প্রথমত, নদীর চর জল বয়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ। তাতে খোঁড়াখুঁড়ি করলে বা সমান করে ফেললে নদীখাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বর্ষায় জল বাড়লে তা স্বাভাবিক ভাবে বয়ে যেতে বাধা পায়। দ্বিতীয়ত, চরের উপরটা শুকনো হলেও তার তলায় জলপ্রবাহ থাকে। সভাস্থলের চার পাশে অনেক সময়ই উন্মুক্ত শৌচাগার তৈরি হয়। সেখান থেকে ছড়ায় দূষণ। দূষিত জল ভূগর্ভের জলের সঙ্গে মিশে ভাঁড়ারের ক্ষতিও করতে পারে। তৃতীয়ত, নদীর বাস্তুতন্ত্রে প্রচুর আণুবীক্ষণিক প্রাণীও জুড়ে থাকে। পরিবেশে তাদের গুরুত্বও কম নয়। সভার ফলে সেই জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশষজ্ঞদের একাংশ। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের বাঁকুড়া শাখার সম্পাদক জয়দেববাবুরও দাবি, ‘‘নদীর চরকে অনুষ্ঠানের যোগ্য করে তুলতে ভারী যন্ত্র নামানো হচ্ছে। এর ফলে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বালুচর। পরিবেশের উপরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন কিছু কাম্য নয়।’’
সহ প্রতিবেদন: কুন্তক চট্টোপাধ্যায়