ফাইল চিত্র
করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর খবরে অনেকেই গোড়ার দিকে সংবাদপত্র থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু সংবাদপত্র থেকে করোনা সংক্রমণের ভয় নেই বলে বিশেষজ্ঞদের মতামতে আশ্বস্ত হয়ে ফের তাঁরা পুরনো অভ্যাসে ফিরে গিয়েছেন। সকালে চায়ের কাপ হাতে খুলে বসছেন প্রিয় সংবাদপত্র। বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন জানাচ্ছেন, তাঁরা নির্ভাবনায় কাগজ পড়ছেন।
দুই জেলার চিকিৎসক থেকে বিশিষ্টজনদের অনেকেই জানাচ্ছেন, ‘লকডাউন’-এর শুরুতে দু’-এক দিন সংবাদপত্র মেলেনি। তার পরে এক দিনও সংবাদপত্র নেওয়া বন্ধ করেননি তাঁরা। হকারেরাও জানাচ্ছেন, করোনা-সংক্রমণের ভয়ে যাঁরা নিজেদের দূরে রাখছিলেন, তাঁরাও এখন সংবাদপত্র দিতে বলছেন। বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার পরে, আগের মতোই গ্রাহকেরা তা সংগ্রহ করেছেন।
চিকিৎসকদের দাবি, সংবাদপত্র তৈরির সময়ে যে সব রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তার উপরে ‘ড্রপলেট’ বেঁচে থাকতে পারে না। ‘নেকেড’ ভাইরাস কোনও ভাবেই নয়। এ সব ক্ষেত্রে সাধারণ বোধের উপরে জোর দিতে বলছেন চিকিৎসকেরা।
পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো মেডিক্যালের চিকিৎসক তথা পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের জেলা সম্পাদক নয়ন মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘সংবাদপত্রের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ ছড়াতে পারে বলে কোথাও কোথাও ভিত্তিহীন কথা বলা হচ্ছে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ায় না। যদি কাগজের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ায়, তাহলে তো টাকার লেনদেনই প্রথমে বন্ধ করা প্রয়োজন। সংবাদপত্র ছাপা থেকে শুরু করে মাত্র কয়েকজনের হাত ঘুরে আমাদের কাছে আসছে। সে ক্ষেত্রেও সংবাদপত্র যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম সর্তকতা বিধি মেনেই কাজটা করছেন।’’
তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে নিজেদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে। সেই সঙ্গে অযথা আতঙ্কিত হওয়া চলবে না।
বাঁকুড়া মেডিক্যালের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধানের কথা, “লকডাউন উঠতেই সাধারণ মানুষ ফের বাজারমুখো হয়ে প্যাকেটবন্দি খাবার কেনা শুরু করেছেন। সংবাদপত্র থেকে সংক্রমণের ভয় থাকলে, প্যাকেটবন্দি খাবারে তো কেউ ভয় করেন না! আমি তো প্রতিদিনই খবরের কাগজ পড়ি।”
বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেবনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরও মত, “সংবাদপত্র পড়তেই হবে। আমি প্রথমে কিছুক্ষণ সংবাদপত্র বাড়িতে এনে ফেলে রাখি। তার পরে পড়ি। কই আমার তো কিছু হয়নি এত দিনে।” পুরুলিয়ার সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামক সুবলচন্দ্র দে বলেন, ‘‘সংবাদপত্র আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। সংবাদপত্র থেকে করোনার সংক্রমণ ছড়াতে পারে এই বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের বিষয়েও শোনা যায়নি। আমরা জেনেছি, সংবাদপত্র ছাপা থেকে শুরু করে বাড়িতে পৌছে দেওয়া পর্যন্ত সমস্ত রকমের সর্তকতা মানা হচ্ছে। তাই কোনও দিনই বাড়িতে সংবাদপত্র নেওয়া বন্ধ করিনি।’’
শিক্ষক তথা পুরুলিয়ার লোক গবেষক সুভাষ রায় জানান, সংবাদপত্রের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ ছড়ায় বলে ডাক্তার বা স্বাস্থ্য দফতর কখনই বলেনি। অহেতুক একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। তবে এখন অবশ্য তা কেটে গিয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আমি অবশ্য ‘লকডাউন’ পর্বে কোনও দিনই বাড়িতে সংবাদপত্র নেওয়া বন্ধ করিনি।’’
যে হকারদের মধ্যে ধন্দ ছিল, তাঁরাও কাগজ পৌঁছে দিচ্ছেন বাড়ি বাড়ি। বাঁকুড়ার সানবাঁধা সংলগ্ন তমালতলার বাসিন্দা রামপ্রসাদ গড়াই দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সংবাদপত্র বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, ‘‘সংবাদপত্র থেকে করোনা ছড়ালে তো আমরাই সবার আগে আক্রান্ত হতাম। পাঠকেরা এখন বুঝেছেন। বড় সংখ্যক পাঠকই ফের সংবাদপত্র কেনা শুরু করেছেন।”